মালয়েশিয়ায় ৯ দিন

মালয়েশিয়ায় ৯ দিন
প্রকাশ : ২৪ এপ্রিল ২০১৬, ১১:৩৬:৪২
মালয়েশিয়ায় ৯ দিন
কুয়ালালামপুরের কেএলসিসি টুইন টাওয়ারের সামনে লেখক
জহিরুল ইসলাম
প্রিন্ট অ-অ+
২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল। অনেকটা দুরুদুরু বুকে মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে হযরত শাহজালাল এয়ারপোর্টের দিকে পা বাড়ালাম। এর আগে আমার বিদেশ ভ্রমণ বলতে শুধুই ভারত। কিন্তু পাসপোর্টে তারও কোনো প্রমাণ নেই। কারণ ডিজিটাল পাসপোর্ট করার সময় ঝামেলা মনে করে আগের মেয়াদোত্তীর্ণ পাসপোর্টের কথা উল্লেখ করিনি। তার মানে সম্পূর্ণ সাদা পাসপোর্ট। এটা যে পরবর্তীতে অসুবিধার কারণ হতে পারে তখন একেবারেই মাথায় আসেনি।
 
এর আগে ভিসা নিয়ে বেশ চিন্তায় থাকলেও সেখানে কোনো সমস্যা হয়নি। চিন্তা ছিল এই কারণে যে আমি ভিসার জন্য পাসপোর্ট জমা দেওয়ার তিন-চার দিন আগে আমার এক সহকর্মীর পাসপোর্ট ফেরত আসে হাইকমিশন থেকে। এর ওপর আমার পাসপোর্টে পূর্বের কোনো ভিসা নেই। কিন্তু ভিসা পাওয়ার নির্দিষ্ট দিনে ভিসা প্রসেসিং প্রতিষ্ঠান থেকে আমাকে ফোন করে জানানো হলো, আপনার ভিসা হয়ে গেছে। পাসপোর্ট নিয়ে যান।
শাহজালালে দুই বিপত্তি : প্রথম বিপত্তিটা বাধল শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। বোর্ডিং কার্ডের জন্য পাসপোর্ট নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু আমার পাসপোর্টটি ভালোভাবে উল্টেপাল্টে দেখে ডেস্ক থেকে বলা হলো, আপনি পাশের চেয়ারে গিয়ে বসুন। আমি বললাম, সমস্যাটা কী? ডেস্কের ভদ্রলোক বললেন, আপনার সাথে কথা আছে। আমি বললাম, যা বলার এখনই বলুন। আপনি অন্যদের বোর্ডিং কার্ড দিচ্ছেন আর আমি পাশে বসব এটা তো হতে পারে না। আমার দৃঢ়তা দেখে ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কী করেন? আমি বললাম, একটা সংবাদপত্রে কাজ করি। এবারে ভদ্রলোকের চেহারায় কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ করলাম। তিনি এবার বললেন, আপনার কার্ড আছে? আমি বললাম, ভিজিটিং কার্ড এবং আইডি কার্ড দুটোই আছে। তিনি বললেন, আইডি কার্ডটা দিন। আমি দিলাম। এবারে ভদ্রলোকের আচরণ পুরোই পাল্টে গেল। তিনি আমার বোর্ডিং কার্ডটা নিয়ে সিট থেকে উঠে এলেন এবং আমার হাতে দিয়ে গেলেন। দুয়েকটা সৌজন্যমূলক কথাও বললেন আমার সঙ্গে। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
 
এবারে দ্বিতীয় বিপত্তি: ইমিগ্রেশনের কাউন্টারে গিয়ে দাঁড়ালাম। সেখানে কর্মরত অফিসারটি দীর্ঘক্ষণ আমার পাসপোর্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে লাগলেন। এক পর্যায়ে আরেকজন অফিসারকে ডেকে আনলেন। আমার পাসপোর্টটি তার হাতে দিয়ে বললেন, দেখুন তো এটা ওনার ছবি কি না। ওই ভদ্রলোক পাসপোর্ট দেখে বললেন, অসম্ভব। এটা ওনার ছবি না। আমি তো ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়ার দশা। এবার আমি বললাম, তিন মাস আগে পাসপোর্ট অফিস থেকে আমার ছবি তোলা হলো। আর এখন আপনি সে ছবির সঙ্গে আমার মিল পাচ্ছেন না। এখন আমার করণীয় কী বলুন। কাউন্টারের ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কী করেন? আমি বললাম, আমি একটি সংবাদপত্রে কাজ করি। এই দেখুন আমার আইডি কার্ড। ওখানকার কিছু বাঙালি আমাকে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ করেছে। তাই যাওয়া। এবারে আর আমার ছবি নিয়ে তার কোনো সমস্যা থাকল না। তিনি পাসপোর্টে সিল দিয়ে আমার হাতে দিলেন। আমি আবারও হাঁফ ছাড়লাম।
 
মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশনে : পথে আর কোনো বিড়ম্বনা ছাড়াই মালয়েশিয়া বিমানবন্দরে গিয়ে নামলাম। কিন্তু যেহেতু আমার পাসপোর্টে আর কোনো ভিসা নেই, তাই মালয়েশিয়া ইমিগ্রেশনও আমাকে খুব সহজভাবে নিল না। সেখানকার ইমিগ্রেশন কাউন্টারে কর্মরত তরুণীটি আমাকে পাসপোর্ট ফেরত দিয়ে তাদের অফিসের রাস্তা দেখিয়ে দিলেন। আমি অফিসে গেলাম। কর্মরত অফিসারটির হাতে পাসপোর্টটি দিলাম। আমার মতো অনেকেই পাসপোর্ট জমা দিয়ে অদূরে বসে আছেন। আমি সেদিকে না গিয়ে অফিসারটির সামনের চেয়ারটিতে বসে পড়লাম। দীর্ঘক্ষণ তার সাথে আমার বাক্য বিনিময় চলল। আমি কী করি, কেন এসেছি, টাকা পয়সা কত এনেছি, কোথায় থাকব, নানা প্রশ্ন। যেহেতু আমার মনের মধ্যে কোনো খারাপ অভিসন্ধি নেই, অর্থাৎ আমি তাদের দেশে থাকার জন্য যাইনি, তাই আমার কথাবার্তার মধ্যে কোনো জড়তা ছিল না। এটা নিশ্চিত হয়ে অবশেষে তিনি আমার আঙুলের ছাপ নিলেন এবং আমার পাসপোর্টে সিল দিয়ে ফেরত দিলেন।
অবশেষে স্বস্তি : তখন রাত তিনটা। পাসপোর্ট হাতে নিয়ে কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্ট থেকে বের হওয়ার গেটের কাছে এসে দেখলাম অনেক বাঙালি সেখানে অপেক্ষা করছেন সকাল হওয়ার জন্য। এদের মধ্যে অনেকেই পুরনো। যাদের সঙ্গে কথা হয়েছে তাদের মধ্যে আমার মতো প্রথমবার মালয়েশিয়ায় গেছি এমন কাউকে দেখলাম না। আগেই জেনে এসেছি, এয়ারপোর্ট থেকে বন্ধু আনোয়ারের বাসার দূরত্ব প্রায় ষাট কিলোমিটার। ওর বাসা সেলেঙ্গর প্রদেশ বা জেলার কেলাংয়ে সিটিতে। সেখানে সপরিবারে বসবাস ওর। আনোয়ার বলে দিয়েছিল, ইমিগ্রেশনের কাজ হয়ে গেলে ওকে ফোন করতে। আর আমার ইচ্ছা ছিল, বাসে বা ট্যাক্সিতে গিয়ে ওকে চমকে দেওয়ার। কিন্তু শেষমেশ আর সে সাহস হলো না।
 
মোবাইল ফোন, বাংলাদেশ বনাম মালয়েশিয়া : ঢাকায় যখন মালয়েশিয়ায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম তখন চিন্তা করলাম আমার ঢাকার মোবাইল ফোনটিকে রোমিং করিয়ে নিয়ে যেতে পারলে দেশের সবাই সহজে আমাকে পাবে। তাই টেলিটক কাস্টমার কেয়ারে ফোন করলাম। সেখান থেকে জানানো হলো, ভিসার ফটোকপি, দশ হাজার টাকা জামানত, ইন্টারন্যাশনাল ক্রেডিট কার্ড লাগবে। আমি বললাম, আমার তো প্রিপেইড মোবাইল। ক্রেডিট কার্ড লাগবে কেন? আর আমি তো দেশেই ক্রেডিট কার্ড ইউজ করি না, করি ডেবিট কার্ড। সেটা হলে চলবে কি না? উনি জানালেন, না চলবে না। বুঝলাম, হবে না। ফোনে সে কথা বন্ধুকে জানানোর পর সে বলল, কোনো চিন্তা নেই। তুই দেশ থেকে আসার আগেই তোর এখানকার মোবাইল নম্বর আমি পাঠিয়ে দেব। তুই সবাইকে সেই নম্বর দিয়ে এলে সবাই সেই নম্বরে যোগাযোগ করতে পারবে। কিন্তু পরদিন সে নম্বর নয়, এক যাত্রীর কাছে আমার জন্য একটা সিম পাঠিয়ে দিল। আমি ঢাকায় বসে সেই সিম মোবাইলে লাগাতেই সেখানে বিভিন্ন মেসেজ আসতে শুরু করল। অর্থাৎ মালয়েশিয়ার সেই সিমটি বাংলাদেশে রোমিং করাই আছে। এজন্য তাদের কোনো ক্রেডিট কার্ড বা পাসপোর্ট-ভিসা দিতে হয়নি।
 
বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ : ফোন সাথেই ছিল। বন্ধুকে ফোন দিলাম। সে বলল, আমার হিসাবে একটু ভুল হয়ে গেছে। তোকে আনতে যাব বলে আমি ফোনে অ্যালার্ম দিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু হিসাবে একটু গড়বড় হয়ে গেছে। তুই ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা কর। আমি আসছি। আমি বললাম, কোনো অসুবিধা নেই, তুই দরকার হলে সকালে আয়। অথবা আমাকে বলে দে কীভাবে আসতে হবে, আমি ঠিকই চলে আসব। ও বলল, না, তুই নতুন মানুষ। আমিই আসছি। আমি এয়ারপোর্টে চার নম্বর গেটে অপেক্ষা করছি জানিয়ে ফোন রেখে দিলাম।
অপেক্ষা করতে আমার অবশ্য খারাপ লাগছিল না। কারণ সব কিছুই আমার কাছে নতুন। এয়ারপোর্টের মধ্যে বড়পর্দার টেলিভিশন চলছে। কিছুক্ষণ দেখলাম। ঘুরে ঘুরে দোকানপাট, লোকজন দেখতে লাগলাম। বিমানবন্দরের এক কর্মী এসে আমাকে চমকে দিয়ে সবাইকে বলল, আপনারা একটু চেপে দাঁড়ান। মানুষ হাঁটার জায়গা দিয়েন। অর্থাৎ বাঙালি। এমন সময় বন্ধু আনোয়ারের ফোন। তুই যে গেটে দাঁড়িয়ে আছিস সেখান থেকে বের হয়ে একটু বাঁ দিকে তাকা। আমি বাইরে এসে বাঁয়ে তাকাতেই দেখলাম বন্ধু আনোয়ার দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশে একটা প্রাইভেট কার। নিজেই চালিয়ে এসেছে। আমাকে পেয়ে ও জড়িয়ে ধরল। আনোয়ার আমার বাল্যবন্ধু, তাই ওর সঙ্গে আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার কিছু নেই। কিন্তু এত রাতে ও ঘুম থেকে উঠে আমার জন্য এতদূর ড্রাইভ করে এসেছে এজন্য কিছুটা অবাক হলাম।
 
রাতের মালয়েশিয়ার রাস্তায় দুই বন্ধু : বন্ধু গাড়ি চালাচ্ছে আর দুজন কথা বলছি। এমন সময় ও বলল, তুই তো আমাকে তিনশ টাকা জরিমানায় ফেলবি। আমি বললাম, কেন কী হয়েছে। ও বলল, তুই সিটবেল্ট বাঁধিসনি কেন? আমি বললাম, আমাদের এসব অভ্যাস নেই। আমি সিটবেল্ট বাঁধলাম। বন্ধু বলল, এখন তো বাসায় গিয়ে ঘুম হবে না, তার চেয়ে চল, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরি। আমি বললাম, খুব ভালো। আসলে আমি তো তাই চাচ্ছিলাম।
 
আনোয়ার ওর বাসার দিকে গাড়ি না চালিয়ে অন্য রাস্তায় গাড়ি চালাতে লাগল আর আমাকে সেসব জায়গার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে লাগল। এমন সময় ফজরের আজান দিল। ও বিশাল একটা পেট্রলপাম্পের এরিয়ার মধ্যে গাড়ি থামিয়ে আমাকে বলল, তুই এখানে দাঁড়া, আমি নামাজটা পড়ে আসি। আমি বললাম, সারা রাস্তায় সিগারেট খাইনি। আমি সিগারেট খাব। ও আমার হাতে মালয়েশিয়ার চৌদ্দ টাকা পঁচিশ পয়সা ধরিয়ে দিয়ে বলল, কাছের ওই দোকানটা দিয়ে এক প্যাকেট ডানহিল ম্যারা বা রেড সিগারেট নিয়ে এখানে দাঁড়া। তবে সিগারেট ধরাস না, কারণ এটা পেট্রলপাম্প। আমি দোকানে ঘুরে ঘুরে সিগারেট খুঁজতে লাগলাম। নানান রকম খাবার আইটেমে ঠাসা দোকান। কিন্তু সিগারেট দেখছি না। অবশেষে সেলসম্যানকে বললাম, ডানহিল রেড।
 
সিগারেট নিয়ে ফিরে এসে দেখি আনোয়ারও হাজির। ও আমাকে পেট্রলপাম্পের কর্নারের দিকের ছোট্ট বিল্ডিংটার ভিতরে নিয়ে ঘুরিয়ে দেখিয়ে আনল, ওজুখানা, নামাজ পড়ার জায়গা। বলল, এখানে প্রতিটি পেট্রলপাম্পের সঙ্গেই এভাবে নামাজের জায়গা আছে। আছে বিশাল পার্কিংয়ের জায়গা। যে-কেউ চাইলেই গাড়ি পার্ক করে নামাজ পড়ে নিতে পারে। আমরা আবার গাড়িতে উঠলাম। এবারে আমি বললাম, দোস্ত ঢাকায় যেভাবে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে চা খাই সেভাবে চা খাব। ও সত্যি সত্যি রাস্তার পাশে একটা দোকানে নিয়ে গেল। সেই দোকানে আমরা নাশতা খেলাম। চা খেলাম।
বন্ধুর বাসায় : নাশতা সেরে আমরা ওর বাসার দিকে রওনা হলাম। কেলাংয়ে বিশাল একটা অ্যাপার্টমেটের তিনতলার একটা ফ্লোরে বন্ধু আনোয়ারের বাসা। অ্যাপার্টমেন্টের সামনে আমাকে নামিয়ে দাঁড়াতে বলে ও গেল গাড়ি পার্ক করতে।  আমি দাঁড়িয়ে আছি, এমন সময় আরেক উপদ্রব। এক সদ্য কৈশোর-উত্তীর্ণ নেপালি ছেলে এসে মালয়েশিয়ার ভাষায় কী সব বলতে লাগল। আমি কিছুক্ষণ ওর কথা শুনলাম। এক পর্যায়ে ইংরেজিতে বললাম, আমি তো ভাই তোমার ভাষা বুঝি না। আমি বাঙালি, একমাত্র বাংলা ভাষাই বুঝি। সে এবার বেশ ভালো ইংরেজিতে বলল, আমি আসলে নেপালি। নেপালি ভাষাটা ভালো বলতে পারি। আর মালয়েশিয়ায় যেহেতু চাকরি করি তাই মালয় ভাষাও কিছুটা জানি। ইংরেজি ভাষা ভালো জানি না। আমি বললাম, তাহলে তো তোমার সাথে আমার কথা চলে না। কারণ আমি শুধু বাংলা ভাষাই জানি। সে আমাকে পটানোর জন্য বলল, আপনি তো ভালো ইংরেজিও জানেন। এবারে সে তার আসল উদ্দেশ্য বলল, আপনি আমাদের দোকানের এক কাপ চা খেয়ে যান। এই চা খেলে...। আমি বললাম, দেখো ভাই, আমি এইমাত্র বাংলাদেশ থেকে এসেছি। রাস্তায় চা-নাশতা খেয়েছি। তার ওপর যাচ্ছি বন্ধুর বাসায়। বন্ধু গেছে গাড়ি পার্ক করতে। এখনই এসে পড়বে। কিন্তু সে বড় নাছোড়বান্দা। তার চায়ের গুণগান চলতে লাগল। এমন সময় বন্ধু এসে আমাকে উদ্ধার করল। আমরা ভেতরে ঢুকে তিনতলায় উঠে গেলাম। আনোয়ারের বউ আর দুই ছেলেমেয়ের সংসার। স্বাভাবিকভাবেই বাসার ভেতরে বাংলাদেশের পরিবেশ।
 
কেলাংয়ে মিনি বাংলাদেশ : গোসল, ঘুম, দুপুরের খাওয়া সেরে বিকেলে গেলাম আনোয়ারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। নিচতলায় ওর বিশাল এক ডিপার্টমেন্টাল স্টোর আর দোতলায় অফিস, স্টাফদের থাকার জায়গা। কাজে লাগে না বলে দুটো রুম সাবলেট দিয়েছে। জানলাম, কেলাংয়ের এই জায়গাটায় বাংলাদেশিদের ৪৭টা দোকান আছে। প্রায় সব দোকানের সাইনবোর্ডে ইংরেজি আর মালয় ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষাও শোভা পাচ্ছে। কারণ অনেক বাংলাদেশির বাস এই এলাকায়। প্রতিটা দোকানই বাংলাদেশি পণ্যে ঠাসা। প্রাণ, প্রমো ইত্যাদির গাড়ি এসে জিনিসপত্র দিয়ে যাচ্ছে। আছে চাল ডাল মুড়ি চিড়া লুঙ্গি দই মিষ্টি সরিষার তেল হলুদ মরিচ বাংলা বই বাংলাদেশি গানের সিডিসহ সব কিছুই। এক ভদ্রলোক এলেন পান কিনতে। কিন্তু সেলসম্যান জানালেন, পান নেই কিন্তু জর্দা আছে। আমি ঘুরে ঘুরে আশপাশের দোকানগুলো দেখতে লাগলাম। আনোয়ার ওই এলাকায় বেশ পুরনো। আমি আনোয়ারের মেহমান, তার ওপর সাংবাদিক, তাই অনেকেই এসে আমাকে চায়ের দাওয়াত দিলেন। নানাভাবে আপ্যায়ন করতে চাইলেন। জানালেন বিভিন্ন তথ্য। দেখলাম, বাঙালি কাস্টমাররা এসে দোকানির সঙ্গে সরাসরি বাংলা ভাষায় কথা বলছেন।
 
বাংলাদেশ হাইকমিশনে পহেলা বৈশাখ উদযাপন : ১৩ এপ্রিল বিকেলের দিকে কুয়ালালামপুর থেকে বঙ্গমাতা ফাউন্ডেশনের সভাপতি মতিয়ার রহমান ফোন করলেন আনোয়ারের কাছে। আনোয়ার ফাউন্ডেশনের অন্যতম সহ-সভাপতি। হাইকমিশন ওকে আগেই দাওয়াত কার্ড পাঠিয়ে দিয়েছিল। মতিয়ার রহমান বললেন, কাল সকালে আপনার মেহমান নিয়ে সময়মতো এসে পড়বেন। আনোয়ার সম্মতি জানাল। পরদিন খুব সকাল সকাল আমরা রওনা হলাম কুয়ালালামপুরের উদ্দেশে।
পরদিন সকালে দুই বন্ধু গাড়িতে চেপে চলে গেলাম কুয়ালালামপুরের বাংলাদেশ হাইকমিশনে। সেখানে আমার জন্য বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। এই প্রথম আমি বাংলাদেশের বাইরে নববর্ষ উদযাপন করছি। দেখলাম, বাংলাদেশ হাইকমিশন প্রাঙ্গণে মিনি এক রমনা উদ্যান। গাছের ছায়ায় স্টেইজ। চলছে বর্ষবরণের সঙ্গীত। পাশেই আয়োজন পান্তা ইলিশ, নানা রকমের ভর্তা, মিষ্টি। সবাই জানালেন, এই হাইকমিশনার মো. শাহিদুল ইসলাম সাহেব খুব ভালো মানুষ। তিনি তার রুমে ‘প্রবেশ নিষেধ’ নামক নিষেধাজ্ঞাটি তুলে দিয়েছেন। যার ফলে সবাই যে-কোনো সমস্যা নিয়ে সরাসরি তার কাছে যেতে পারেন।
 
পরিচয়, কথা হলো ভদ্রলোকের সঙ্গে। সেখানে দেখা হলো ঢাকা থেকে যাওয়া বৈশাখী টেলিভিশনে কর্মরত মোস্তফা ফিরোজের সঙ্গে। যিনি জনকণ্ঠে আমি যখন কর্মরত তখন সেখানকার সিনিয়র রিপোর্টার ছিলেন। অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করলেন ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়। একবুক ভালোলাগা নিয়ে দুপুরে দুই বন্ধু আবার কেলাংয়ে ফিরে গেলাম।
 
মমতাজ নাইট : ওই দিন সন্ধ্যায় কুয়ালালামপুরের চিনহু স্টেডিয়ামে ছিল বাংলাদেশের সঙ্গীতশিল্পী মমতাজের সঙ্গীতানুষ্ঠান। নামে স্টেডিয়াম হলেও আসলে একটি হলরুম। বেশ উঁচুতে হলটা। বলতে গেলে একটা পাহাড়ের ওপর। আনোয়ারের পুরো ফ্যামিলিসহ আমরা সবাই গিয়ে হাজির হলাম। নির্দিষ্ট সময়ে অনুষ্ঠান শুরু হলো। স্থানীয় দুয়েকজন শিল্পী গান গাইলেন। এরপর এলেন বিখ্যাত পপশিল্পী আজম খান। এমন সময় শুরু হয়ে গেল সামনের দিকের সিটে বসা নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড। আমি বঙ্গমাতা ফাউন্ডেশনের সভাপতি আর সহসভাপতির গেস্ট, তাই আমার গলায় একটি কার্ড ঝুলিয়ে দিয়ে সামনের সিটে বসার সুযোগ দেয়া হয়েছিল। ভাগ্যিস আমি আগেই দ্বিতীয় সারিতে আনোয়ারের ছেলে আবির আর মেয়ে সুমাইয়ার পাশে এসে বসেছিলাম। সেই গণ্ডগোল শেষ পর্যন্ত স্টেজে মারামারি এবং মাথা ফাটাফাটি পর্যন্ত গড়াল। শেষ পর্যন্ত মাইকে একজন ‘পুলিশ পুলিশ’ বলে চিৎকার করতেই হলের সামনে অবস্থানরত মালয়েশিয়ার পুলিশ এসে কয়েকজনকে ধরে নিয়ে গেল। ততক্ষণে হল অর্ধেক ফাঁকা। ভাঙা অনুষ্ঠান আবার কিছুটা মাতিয়ে তুললেন শিল্পী মমতাজ।
 
দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন : নয় দিন মালয়েশিয়ায় অবস্থানকালে আমরা দুই বন্ধু ঘুরে বেড়িয়েছি মালয়েশিয়ার তিনটি শহর। কেলাং হচ্ছে অনেকটা শহরতলির মতো। এটা আসলে সেলেঙ্গার প্রদেশ বা জেলা একটা সিটি। এ ছাড়া কুয়ালালালামপুর সিটির কেএলসিসি টুইন টাওয়ারসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান এবং পুত্রাজায়ার বিভিন্ন স্থান আমরা দুই বন্ধু ঘুরে বেড়িয়েছি। ভ্রমণ কাহিনী লেখার স্বার্থে সেসব স্থানের কাহিনী কিছুটা বাস্তবিকভাবে, কিছুটা অতিরঞ্জিত করে বর্ণনা করা যেত। কিন্তু প্রকৃত অর্থে এমন সব সৌন্দর্যের কিছু কিছু আমাদের দেশেও আছে। যেমন, সেখানকার মার্কেট, কেনাকাটার কথা যদি লিখতে হয় তবে আমাদের দেশের বসুন্ধরা সিটি, যমুনা ফিউচার পার্ক  এসব স্থানের কথা লেখা যায়, পুত্রাজায়ার সৌন্দর্যমণ্ডিত ব্রিজের কথা যদি বলতে হয়, তবে আমাদের দেশের হাতিরঝিলের কথাও বর্ণনা করা যায়, সেখানকার থিমপার্কের কথা যদি লিখতে হয়, তবে আমাদের দেশের ফ্যান্টাসি কিংডম, যমুনা ফিউচার পার্কের বিভিন্ন রাইড বা নন্দন পার্কের কথাও লেখা যায়। আর এসব স্থানের বর্ণনা নেটে সার্চ দিলে বিস্তর পাওয়া যায়। তাই আমি এই লেখার আকৃতির কথা চিন্তা করে সে বর্ণনায় আর যাচ্ছি না।
 
যা কিছু ভালো লেগেছে : মালয়েশিয়ায় আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে রাস্তায় যান চলাচলে শৃঙ্খলা। বন্ধু আনোয়ারের সঙ্গে ওর গাড়িতে ঘুরে বেড়িয়েছি বলে বাসে ওঠার সুযোগ খুব বেশি হয়নি আমার। তবে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য দুদিন খুব স্বল্পপাল্লার বাসে চড়েছি। ওখানকার ইন্টারসিটি বাসেও মূলত স্টাফ একজনই। আমাদের মতো ড্রাইভার, কন্ডাকটর আর হেলপারের দরকার হয় না ওদের। শুরুর স্টেশনে ড্রাইভার নিজেই হ্যান্ডমাইক নিয়ে যাত্রী ডাকেন।  যাত্রী ওঠার পরে তিনি ড্রাইভিং সিটে বসে যান। যাত্রীরা মেশিনে ভাড়া পরিশোধ করেন। পথে নির্দিষ্ট স্টপেজে প্যাসেঞ্জাররা ওঠানামা করেন। সেখানে সময়ক্ষেপণ নেই। নেই অন্য বাসের সঙ্গে পাল্লা।
 
এ ছাড়া চলতি পথে দেখেছি, সবাই লেন মেনে গাড়ি চালান। গাড়ির গতির ওপর নির্ভর করে যে যার লেনে গাড়ি চালান। খুব বেশি প্রয়োজন না হলে কেউ লেন পরিবর্তন করেন না। যখন রাস্তায় অন্য একটি গাড়িও থাকে না, তখনও সিগন্যাল পড়লে দাঁড়িয়ে যায় গাড়ি। আমাদের ঢাকা শহরে জ্যাম পড়লে উল্টাপাল্টা গাড়ি রেখে আমরা সে জ্যামকে আরও অসহনীয় করে তুলি। কিন্তু মালয়েশিয়ার রাস্তায়ও আমাদের মতো অফিস টাইমে বিশাল জ্যাম লেগে যায়। আমরা জ্যামের ভিতর এমনভাবে গাড়ি রাখি যে একজন পথচারীর রাস্তা পার হওয়ার সুযোগ থাকে না। কিন্তু ওখানে প্রচ- জ্যামের মধ্যেও প্রতিটি গাড়ি সামনের গাড়ি থেকে বেশ দূরে দাঁড়িয়ে থাকেন। তা ছাড়া রাস্তা ভুল করলে কেউ আমাদের মতো রংসাইডে গাড়ি ঘুরিয়ে জায়গামতো ফিরে আসে না। এরকম ভুল করার খেসারত আমরা একদিন দিয়েছিলাম। কেলাং থেকে দুজন গল্প করতে করতে পুত্রাজায়া যাচ্ছিলাম। কোনো এক সময় ভুল করে পুত্রাজায়ার দিকে টার্ন নেওয়া রাস্তা পেছনে ফেলে যাই আমরা। যার খেসারত দিতে হয়েছে প্রায় সত্তর কিলোমিটার বাড়তি রাস্তা ঘুরে এসে।
 
আমাদের দেশে যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারে টোল দিতে হয় বলে অনেককেই আক্ষেপ করতে শুনি। কিন্তু মালয়েশিয়ার পথে পথেই টোল প্লাজায় ভরা। সব ড্রাইভারের কাছেই প্রিপেইড কার্ড থাকে। কার্ড ছোঁয়ালেই নির্দিষ্ট পরিমাণ পয়সা কেটে নিয়ে গেট খুলে যায়। আছে নগদ শোধ করার ব্যবস্থাও। কিন্তু এ নিয়ে কারও কোনো আক্ষেপ নেই।
 
নয় দিন পর একবুক ভালোলাগা নিয়ে ফিরে এলাম প্রিয় ঢাকা শহরে। আমি প্রচণ্ড আশাবাদী মানুষ। তাই আশা করি, আমাদের ঢাকা শহরের যানবাহন চালকরাও একসময় নিয়মানুবর্তী হয়ে উঠবে। এক সুন্দর ঢাকা শহর গড়ে উঠবে শিগগিরই। গড়ে উঠবে আরও সুন্দর এক বাংলাদেশ। তখন আর কথায় কথায় বিদেশের উদাহরণ দিতে হবে না। এবং সে পথেই হয়তো আমরা এগুচ্ছি।
 
লেখক : সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক
 
বিবার্তা/মহসিন
সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (২য় তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১১৯২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2020 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com