অব্যাহত খুনের দায় কার ?

অব্যাহত খুনের দায় কার ?
প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০১৬, ১৫:৪৩:০১
অব্যাহত খুনের দায় কার ?
শারমিন সুলতানা
প্রিন্ট অ-অ+
বেশ কিছুদিন ধরে দেশ এক অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। ৯ দিনে খুন হয়েছে ৪০ জনের মত। চারিদিকে বিরাজ করেছে খুনের আতঙ্ক। কে কখন সন্ত্রাসীদের চাপাতির লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন এই ভয় জেঁকে বসেছে সবার মনে। আর কী অপরাধে মানুষ একের পর এক খুন হচ্ছেন, তা কেউ জানছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনও এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ধারনা দিতে পারছে না। 
 
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেজাউল করিম, কাশিমপুর মহিলা কারাগারের সাবেক প্রধান কারারক্ষী রুস্তম আলী ও রাজধানীর কলাবাগানে নিজ বাসায় দুই বন্ধুর খুনের ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক আরও দানা বেঁধেছে। এর আগে এ মাসের শুরুতেই রাজধানীর সুত্রাপুরে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাজিম উদ্দিনকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়। ইসলামপুরের ঝব্বু খানম জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন বেলাল হোসেনকেও মসজিদে ঢুকে একই কায়দায় কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ড গুলোকে বিশ্লেষণ করলে সন্দেহের তীর প্রধানত ৩টি বিষয়ের দিকে যায়। 
 
১) ইসলামিকরণের চেষ্টা ২) দেশকে জঙ্গিবাদের লেবেল দেয়ার চেষ্টা ৩)আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়ে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা। 
 
ইসলামিকরণের চেষ্টা : প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ডের পর আমরা দেখছি কোনো একটি জঙ্গি সংগঠন এই ঘটনার দায় স্বীকার করে নিচ্ছে এবং ওই ঘটনাকে ইসলামের পতাকাকে শক্তিশালী করার জন্য অথবা ইমানি দায়িত্ব থেকে করা হয়েছে বলে মুসলিম প্রধান দেশে সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলমানদের সহানুভুতি আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। যদিও এ ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন বলে মত দিয়েছেন ইসলামিক চিন্তাবিদ মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ। তিনি বলেন, নাস্তিক আখ্যা দিয়ে হত্যা করা ইসলাম সমর্থন করে না। কেউ যদি অপরাধীও হয়, সেই অপরাধীর বিচার নিজের হাতে তুলে নেয়ার অধিকার ইসলাম দেয় না। 
 
মাওলানা মাসউদ আরও বলেন, মানুষকে সচেতন করার জন্য সন্ত্রাসবিরোধী একটি ফতোয়ায় এক লাখ আলেমের স্বাক্ষর গ্রহণ চলছে। ইসলামের নামে যা হচ্ছে তা ইসলামবিরোধী। ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় শায়খ আল ইসলাম বলে পরিচিত হুসাইন আহমেদ মাদানি, প্রখ্যাত আলেম মাওলানা আবুল কালাম আজাদ প্রমূখ ব্যাক্তিবর্গ সারাজীবন ধর্মীয় সম্প্রীতি, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠনে আন্দোলন করে গেছেন । তাই ভাববার সময় এসেছে যারা ইসলামের নামে এমন অ-ইসলামিক কর্মকাণ্ড করছেন তারা মুসলমান অথবা মুসলমানের শুভাকাঙ্ক্ষী কিনা ? নাকি তাদের কু-কর্মের প্রতি সহানুভূতি লাভের চেষ্টা হিসাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে ইসলাম এর নাম ব্যবহার করা হচ্ছে।
 
দেশকে জঙ্গিবাদের লেবেল দেয়ার চেষ্টা: দেশকে জঙ্গিবাদের লেবেল দেয়ার চেষ্টা নতুন কোনো চেষ্টা নয়। এর আগেও আমরা দেখেছি বিভিন্ন মুসলমান দেশ যেমন ইরাক, আফগানিস্থান প্রভৃতি দেশে জঙ্গি লেবেল লাগিয়ে আক্রমন করা হয়েছে। 
আমাদের দেশের ক্ষেত্রেও বিশেষ একটি দেশের জঙ্গি লেবেল দেয়ার অতি উৎসাহ সন্দেহের উদ্রেক করছে। তাদের ইদানীংকালের কর্মকাণ্ড এই সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করে। যেকোনো ঘটনার আগে তারা তাদের কাছে খবর আছে এই কথা বলে সতর্কবার্তা জারি করে তাদের কাছে থাকা কথিত খবরটি সরকারকে দেয়ার পরিবর্তে রহস্যজনক ভাবে চুপ হয়ে যায় এবং ঘটনা ঘটার পর তাদের অতি তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়।
 
যদিও তারা যেসব দেশে জঙ্গি লেবেল লাগিয়ে আক্রমন করছে, সেসব দেশে জঙ্গি ছিল না এবং তাদের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল বলে স্বীকার করেছে কিন্তু ততক্ষণে ওই দেশের ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে । তাই এমন কোনো ষড়যন্ত্র হচ্ছে কিনা এখন ই ভেবে দেখা উচিত এবং এই সমস্ত অতি উৎসাহী দেশের দুতাবাসকে গোয়েন্দা নজরদারিতে নিয়ে আশা উচিত। 
 
আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়ে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা : আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবণতি ঘটিয়ে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা এদেশে নতুন কিছু নয়। হরতালের নামে পেট্রোল বোম, বাসে আগুন, মানুষ পুড়িয়ে মারার উদাহরণ নিকট অতীতে দেখা যায়। রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য বিদেশি নাগরিক হত্যাকাণ্ডের উদাহরণ খুব বেশি পুরনো নয়। আর একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল যুদ্ধাপরাধীর বিচার। এই বিচারে কোনো অপরাধীর চূড়ান্ত রায় কার্যকরের মুহূর্ত যখনই এগিয়ে আসি তখনই আমরা দেখি কখনও গুজব ছড়িয়ে, কখনও লবিস্ট নিয়োগ করে দেশে এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির অবতারণা করা হয়। 
 
সময় এসেছে তদন্ত করে দেখার এই খুনের ঘটনাগুলো যুদ্ধাপরাধীর বিচারের সাথে সম্পৃক্ত কিনা। সর্বোপরি বলা যায়, সরকারের এখন উচিৎ অযাচিত মন্তব্য যা সমাজে বিভান্তির সৃষ্টি করে তা পরিহার করে বিশেষ কিছু ব্যবস্থা নেয়া। সেগুলার মধ্যে রয়েছে যুদ্ধাপরাধীর বিচারের মত জঙ্গিদের বিচারে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে এই অপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা করা।
 
কারণ বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা অনেক সময় ন্যায় বিচারের পথকে রুদ্ধ করে, জঙ্গি বা রাষ্ট্রদ্রোহী কাজ মোকাবেলার জন্য র‌্যাব এবং পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট গঠন, পাড়া মহল্লার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে প্রত্যেক এলাকায় সন্ত্রাস ও জঙ্গি প্রতিরোধ গঠন, আন্তঃ ধর্ম সম্প্রীতি বাড়ানো এবং ধর্ম পালনের নামে যেকোনো ধর্মের প্রতি উস্কানিমূলক এবং কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য কঠর হস্তে দমন। এখনই যদি এই সমস্যা সম্মিলিত ভাবে মোকাবেলা না করা যায় তাহলে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের কারণে যে ক্ষতি হয়ে যাবে তার দায় ব্যক্তি সমাজ রাষ্ট্র কেউ এরাতে পারবে না।
 
লেখক : অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী গবেষক।
 
বিবার্তা/মহসিন
 
সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (২য় তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১১৯২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2020 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com