অঘোরের পাশে বিপন্ন অচিরাৎ

অঘোরের পাশে বিপন্ন অচিরাৎ
প্রকাশ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ১২:৫৯:২৯
অঘোরের পাশে বিপন্ন অচিরাৎ
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+
অঘোর সংস্কৃত শব্দ। সংস্কৃতে এটার অর্থ শান্ত (সখি লো দারুণ আধিভরাতুর এ তরুণ যৌবন মোর, সখি লো দারুণ প্রণয়হলাহল জীবন করল অঘোর- ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; অঘোর ঘুমের ঘোরে ঢলে যবে কালো নদী-ঢেউয়ের কলসী, নিঝঝুম বিছানার পরে মেঘবৌ’র খোঁপাখসা জোছনাফুল চুপে চুপে ঝরে- অস্তচাঁদে, জীবনানন্দ দাস)।
 
কিন্তু বাংলায় অঘোর শব্দটি শান্ত অর্থে ব্যবহৃত হয় না। বাংলায় অঘোর অজ্ঞান, সংজ্ঞাহীন অর্থে ব্যবহৃত হয়। ভয়ঙ্কর অর্থেও বাংলায় অঘোর শব্দের প্রয়োগ আছে (অঘোর বাদল- মানিক গাঙ্গুলীর ধর্মমঙ্গল; নিমের ছায়া ঝিঙের ছায়া তিক্ত ছায়ার পাক, যেই খাবে ভাই অঘোর ঘুমে ডাকবে তাহার নাক- ছায়াবাজী, সুকুমার রায়)। আবার সংস্কৃতে বিশেষ্য পদ হিসেবে ‘অঘোরপন্থী’ শব্দটি চালু রয়েছে। এটার অর্থ শৈব ধর্ম সম্প্রদায় বিশেষ।
 
বাংলা ভাষার একটি অতি বিপন্ন শব্দ ‘অচিরাৎ’। শব্দটির মূল সংস্কৃত ‘অ-চিরাৎ’ মানে ‘চিরকাল হতে।’ কিন্তু সংস্কৃত বিভক্তিযুক্ত এই শব্দটির (ক্রিয়া-বিশেষণ) বাংলা অর্থ হচ্ছে অবিলম্বে, শীঘ্র, আশু (অচিরাৎ অট্টালিকা আবার প্রসন্ন হইয়া হাসিতে লাগিল- বিষবৃক্ষ, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; তোমার ভাণ্ডার খোলা খোলা দ্বার, অকস্মাৎ বাড়ায়েছি হাত, যা দিবার দাও অচিরাৎ!- শেষের কবিতা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; যাইতে যাইতে কাজে কাজেই অচিরাৎ ধনরক্ষাকারী সিপাহীদিগের সহিত সাক্ষাৎ হইল- আনন্দমঠ, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; এইবার ফুরায়েছে পালা, ঘাতকযন্ত্রের কারা অবরুদ্ধ হলো অবশেষে, এইবার উত্তোলিত সম্মার্জনীমূলে পিষ্ঠ হবে অচিরাৎ আকিঞ্চন উঞ্ঝবৃত্তি মম- সমাপ্তি, সুধীন্দ্রনাধ দত্ত)।
 
কবিকঙ্কণ চণ্ডীর অন্নদামঙ্গলেও শব্দটি পাওয়া যায় (মহাদেবের দক্ষ যেন বল কুবচন, অচিরাতে হবে তোর ছাগল বদন)। ধারণা করা হয়, সংস্কৃত ‘হঠাৎ’ শব্দের প্রভাবে সংস্কৃত অচিরাৎ বাংলায় নতুন অর্থ পেতে পারে।
 
আবার মূলানুগ অর্থে অঙ্গ মানে ‘যার দ্বারা আকৃতির বোধ হয়’ (অতএব, দেখা যাইতেছে ছবির যে ছয় অঙ্গ, সমস্ত আর্টের অর্থাৎ আনন্দরূপেরই তাই- ছবির অঙ্গ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।
 
সাধারণত মনুষ্য শরীরে ছয়টি অংশ বা অবয়ব থাকে- মস্তক, হস্তদ্বয়, কটি ও পাদদ্বয়। অঙ্গদ্বার মানে শরীরের বিশেষ নয়টি দ্বার বা ছিদ্র। এগুলো হচ্ছে কর্ণদ্বয়, চক্ষুদ্বয়, নাসাদ্বয়, মুখ, পায়ু ও উপস্থ। 
 
অন্যদিকে অঙ্গধূপ বলতে পুজাদি কার্যে ব্যবহৃত দশ উপাদান বিশিষ্ট ধূপকে বোঝায়। এ দশটি উপাদান হল মধু, মুতা, ঘৃত, চন্দনকাষ্ঠ, গুগ্গুল, অগুরু, শৈলজ, সরলকাষ্ঠ, সিহল (বা সিহ্লক) এবং শ্বেতসর্ষপ। আবার অঙ্গানীল শব্দটি দিয়ে প্রাণ, অপান, সমান, উদান ও ব্যান বোঝায়।
 
অন্যদিকে জীববিজ্ঞানে অঙ্গ (ইংরেজি organ, ল্যাটিন organum, যন্ত্র) হলো একগুচ্ছ কলা যা নির্দিষ্ট একটি বা অনেকগুলি কাজ সম্পন্ন করে। প্রাণি অঙ্গসমূহ হলো হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, মস্তিষ্ক, চোখ, পাকস্থলী, প্লীহা, অস্থি, অগ্ন্যাশয়, বৃক্ক, যকৃৎ, অন্ত্রসমূহ, ত্বক (মানুষের সর্ববৃহৎ অঙ্গ), গর্ভাশয় ও মুত্রথলি। অন্যদিকে উদ্ভিদ অঙ্গসমূহকে বর্ধমান (vegetative) ও পুনরুৎপাদনশীল (reproductive) এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়। বর্ধমান উদ্ভিদ অঙ্গসমূহ হলো মূল, কাণ্ড ও পাতা। আর পুনরুৎপাদনশীল অঙ্গসমূহ হলো পুষ্প, বীজ ও ফল।
 
অন্যদিকে সঙ্গীতে তালের মাত্রাসমূহকে ছন্দোবদ্ধ করার জন্য বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়। এর এক একটি ভাগকে অঙ্গ বলে। অনেকে অঙ্গকে গৃহও বলেন। আবার নৃত্যে শরীরের বিভিন্ন অংশকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। এই ভাগগুলি হলো- অঙ্গ, প্রত্যঙ্গ ও উপাঙ্গ। শরীরের যে সব অংশ আন্দোলিত হয় বা করা যায়, তাদেরকেই বলে অঙ্গ। যেমন শির, হস্তদ্বয়, কটি, বক্ষ, পার্শ্ব ও পদদ্বয়। কেউ কেউ গ্রীবাকেও অঙ্গের মধ্যে ধরেন।
 
দেহের অষ্ট অঙ্গ হচ্ছে দুই হাত, হৃদয়, কপাল, দুই চক্ষু, কণ্ঠ মতান্তরে বাক্য, মেরুদণ্ড মতান্তরে মন। অথবা দুই হাত, পায়ের দুই বৃদ্ধাঙ্গলী, দুই হাঁটু, বক্ষ ও নাসা অথবা প্রণামের অষ্ট অঙ্গ জানু, পদ, পাণি, বক্ষ, বুদ্ধি, শির, বাক্য, দৃষ্টি। 
 
সেনাবাহিনীর অষ্ট অঙ্গ হচ্ছে রথ, হস্তী, অশ্ব, যোথ ও দেশের চার প্রধান ব্যক্তি। অন্যদিকে যোগের অষ্ট অঙ্গ হচ্ছে যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান, সমাধি। আর পূজার অষ্ট উপাচার হচ্ছে জল, ক্ষীর, কুশাগ্র, দধি, ঘৃত, আতপতণ্ডুল, যব ও শ্বেত সর্ষপ। 
 
আবার বিচারালয়ের অষ্ট অঙ্গ হচ্ছে ব্যবহার শাস্ত্র, বিচারক, সভ্য, লেখক, জোতির্বিদ, স্বর্ণ, অগ্নি ও জল। অন্যদিকে আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের অষ্ট অঙ্গ হচ্ছে শল্য, শালাক্য, কায়-চিকিৎসা, ভূতবিদ্যা, কৌমার ভৃত্য, অগদতন্ত্র, রসায়নতন্ত্র ও বাজীকরণ। এছাড়া অষ্ট অলঙ্কার হচ্ছে নাকফুল, কানফুল, কপালে টিকলি, গলায় হার, বাজুতে অনন্ত, হস্তে বলয়, কটিতে হার ও পায়ে মল। 
 
জিয়াউদ্দিন সাইমুমের ব্লগ থেকে
 
বিবার্তা/জিয়া
 
সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (২য় তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১১৯২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2017 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com