হজে দুর্ঘটনা আর চাই না

হজে দুর্ঘটনা আর চাই না
প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৫, ১৫:৫০:৫৯
হজে দুর্ঘটনা আর চাই না
প্রিন্ট অ-অ+

হজে গিয়ে দুর্ঘটনায় গত ৪০ বছরে প্রায় ৪ হাজার হাজি প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে পদদলিত হয়ে ও ভীড়ের কারণে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। গত বৃহস্পতিবার মক্কার কাছে মিনায় পদদলিত হয়ে অন্তত ৭১৭ হাজি মারা যান। এর পরপরই দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় এ ধরণের সংবাদ প্রকাশ হতে থাকে। 


 


মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান হজ। প্রতি বছর ৩০ থেকে ৪০ লাখ মুসলমান সমবেত হন মক্কায়। বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর যোগ দেন এক লাখেরও বেশি ধর্মপ্রাণ মুসলমান। এ বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হজে গিয়েছেন ২০ লাখ মানুষ।


 


১৭ দিন আগে গত  ১১ সেপ্টেম্বর মক্কার মসজিদ আল-হারামে ক্রেইন উল্টে ১১৭ জনের মৃত্যু হয়, আহত হন প্রায় ২৩৮ জন। এরপরই ঘটলো বড় দুর্ঘটনা। 


২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে হজের সময় ১৩ আফগান হাজির সঙ্গে অন্তত আরও ডজনখানেক হাজি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান।


 


২০০৬ সালে মক্কার কাবা শরিফের অদূরে বহুতল আল-গাজা হোটেল ভেঙে পড়ে নিহত হন ৭৬ জন এবং আহত হন আরও ৬৪ জন। ওই বছর জামারাতে শয়তানকে পাথর ছুঁড়ে মারতে গিয়ে পদদলিত হয়ে মারা যান আরও ৩৬৪ জন।


 


২০০৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি আল-জামারাতে শয়তানকে পাথর ছুঁড়ে মারার সময় পদদলিত হয়ে মারা যান ২৪৪ হাজি।


২০০১ সালের ৫ মার্চ ৩৫ জন হাজি মারা যান ওই আল-জামারাতে একই ধরনের ঘটনায়।


 


১৯৯৮ সালের ৯ এপ্রিল ১৮০ জন মারা যান হুড়োহুড়িতে হঠাৎ আতঙ্কিত হয়ে। ওই পদদলিত হওয়ার ঘটনাটিও ঘটে আল-জামারাতে, শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের সময়।


১৯৯৭ সালের ১৫ এপ্রিল মিনায় তাবুতে আগুন লেগে পুড়ে মারা যান ৩৪০ জন হাজি। এ ঘটনায় আহত হন আরও দেড় হাজার।


 


১৯৯৪ সালের ২৩ মে ২৭০ জন মারা যান আল-জামারাতে, যাদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন ইন্দোনেশীয়।


 


এর আগে ১৯৯০ সালের ২ জুলাই মক্কায় মারা যান এক হাজার ৪২৬ জন হাজি। তাদের বেশিরভাগই ছিলেন মালয়েশীয়, ইন্দোনেশীয় ও পাকিস্তানি। সুড়ঙ্গ পথে পদপিষ্ট হয়ে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে।


 


১৯৮৯ সালের ৯ জুলাই মক্কায় দুইটি বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় নিহত হন এক হাজি এবং আহত হন আরও ১৬ জন।


 


১৯৮৭ সালের ৩১ জুলাই মক্কায় ৪০২ জন হাজি নিহত হন, যাদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন ইরানি হাজি। এ ঘটনায় ৬৪৯ জন আহত হন। সৌদি নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে শিয়াদের সংঘর্ষে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে।


 


১৯৭৫ সালের ডিসেম্বরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে তাবুতে আগুন লেগে নিহত হন ২০০ জন হাজি।


 


পত্রিকার খবর ঘেটে মক্কার নিহতের যে ঘটনাগুলো জানা গেল, তাতে মানুষের মনে হজে যাওয়াটা একটা ভীতিকর মনে হলেও হতে পারে। আমরা বলছি না যে, এসব দুর্ঘটনার কারণে মানুষ হজে যাওয়া কমিয়ে দেবেন। না এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। যারা হজে যাবেন তারা মৃত্যুকে ভয় পাওয়ার কথা না। তবে এটা বলা যায় হজে গিয়ে এত মানুষের মৃত্যু কেন হবে? হজে গিয়ে প্রতি বছর দুর্ঘটনায় মৃত্যু কারো কাম্য হতে পারে না। 


 


বাংলাদেশ একটি ছোট গরীব দেশ। এখানে প্রতি বছর বিশ্ব ইশতেমা হয়ে থাকে। হজের পরেই বিশ্ব মুসলিমের সবচেয়ে বড় জমায়েত এটি। কিন্তু গত ৪০ বছরে বিশ্ব ইশতেমায় এ ধরণের দুর্ঘটায় কেউ মারা গেছেন এমন খবর পাওয়া যায়নি। অথচ বিশ্ব ইশতেমায়ও লাখ লাখ মুসল্লী অংশ নিয়ে থাকেন। আখেরি মুনাজাতের সময় যার সংখ্যা কয়েকগুন বৃদ্ধি পায়।  


 


প্রশ্ন হলো সৌদি আরব একটি শীর্ষ ধনি দেশ। তেল বিক্রির টাকায় মধ্যপ্রাচ্যের এই ধনি দেশটির মাথাপিছু আয় ২৬ হাজার মার্কিন ডলার প্রায়। আর হজ থেকে প্রতি বছর তাদের আয় হয় কয়েক হাজার কোটি ডলার। কিন্তু যে পরিমাণে তাদের আয়, সে পরিমাণে হাজিদের নিরাপত্তা দিচ্ছে কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। 


 


মিনা দুর্ঘটনার জন্য এ বছর অনেকেই সৌদি কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছেন। বলা হচ্ছে যেখানে শয়তানকে পাথর মারা হয় সেখানের একটি পথ খোলা রেখে বাকী সবগুলো পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। এজন্য বেশি সংখ্যক হাজির মৃত্যু হয়েছে। 


 


এ দুর্ঘটনার জন্য কেউ কেউ সৌদি আরবের বাদশা সালমানের পুত্র যুবরাজ মোহাম্মদকে দায়ি করেছেন। 


লেবাননের আরবি ভাষার পত্রিকা দৈনিক আল দিয়ার এক প্রতিবেদনে জানায়, হজের তৃতীয় দিনে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটার পেছনে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ সালমান আল সৌদ বিশাল গাড়ি বহর প্রধান ভূমিকা পালন করেছে।  মিনার পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ উপত্যকায় সৌদি বাদশাহ’র ছেলে যাচ্ছিলেন বিশাল হজ জমায়েতে যোগ দিতে।  তার সঙ্গে ছিল ২০০ সেনাবাহিনী ও ১৫০ পুলিশ সদস্য।


 


প্রতিবেদনে বলা হয় সৌদি যুবরাজের উপস্থিতি মানুষের চলাচলের মধ্যে বিঘ্ন ঘটায় এবং হঠাৎ করে দিক পরিবর্তন করায় সেটা থেকে হুড়োহুড়ির সৃষ্টি হয় যা থেকে এই দুর্ঘটনা ঘটে।


দুর্ঘটনার জন্য সৌদি প্রিন্স মোহাম্মদ সালমান আল সৌদের গাড়ি বহরকে দায়ি করে প্রায় একই রকম সংবাদ প্রকাশ করেছে দুবাই থেকে প্রকাশিত পত্রিকা আল-জিদ্দাজ। এছাড়া ভারতে জি-নিউজের এক প্রতিবেদনেও একই দাবি করা হয়েছে।


 


 


ঘটনা যেভাবেই ঘটুক। এটা মর্মান্তিক তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা এ ধরণের মৃত্যু আর চাই না। সৌদি সরকারের উদ্দেশে আমাদের বক্তব্য অত্যন্ত পরিস্কার। মৃত্যু চিরন্তন। তাই বলে হজে গিয়ে পদদলিত হয়ে কেউ মারা যাক তা কেবল আমরা কেন, কেউই চাইবেন না। তাই সৌদি সরকারকে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। ইরান সরকার তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তদন্তের ব্যবস্থা নিতে হবে। দায়িদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। আর আগামী বছর হজের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর না ঘটে।  


 


 


 


 

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (২য় তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১১৯২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2019 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com