আইনপ্রণেতাদের আইনভঙ্গের প্রবণতা রোধ করুন

আইনপ্রণেতাদের আইনভঙ্গের প্রবণতা রোধ করুন
প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর ২০১৫, ১১:২২:২২
আইনপ্রণেতাদের আইনভঙ্গের প্রবণতা রোধ করুন
প্রিন্ট অ-অ+
তিনি একজন আইনপ্রণেতা। জাতীয় সংসদে আইন পাশ করেন। নাম মনজুরুল ইসলাম লিটন। গুলি করেছেন বেআইনীভাবে। তাও একটি শিশুকে। কিন্তু কেন? এ ঘটনায় শিশুটির কোনো অন্যায় বা অপরাধ পাওয়া যায়নি। তাহলে তাকে কেন গুলি করা হলো? এখন চার দিক থেকে দাবি আসছে। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হোক। গাইবান্ধাসহ সারাদেশের সর্বস্তরের মানুষ সাংসদ লিটনের শাস্তি চান। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।শিশুটির পরিবার তার চিকিৎসা করাতে হিমশিম খাচ্ছেন। আহত শিশু সৌরভ কেঁদে কেঁদে তার মাকে প্রশ্ন করছে, মা আমি আবার হাটতে পারবোতো? কি নির্মম বাস্তবতায় আমরা বাস করছি।  
 
শুধু লিটনই নন। এর আগেও এদেশে আইনপ্রণেতাদের আইনভঙ্গের বিভিন্ন ঘটনা আমাদের জানা আছে। লাইসেন্সধারী অস্ত্র দিয়ে বেআইনীভাবে প্রকাশ্যে গুলি করেছেন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন এলাকার এমপি। আমরাতো মগের মুল্লুকে বাস করি না। একজন সংসদ সদস্য হয়ে গেলেই তিনি যা ইচ্ছা তাই করতে পারবেন। বিষয়টি কি এমন?
 
আমরা জানি, মালিবাগে বিএনপির মিছিলে প্রকাশ্যে গুলি করে দীর্ঘদিন আলোচনায় ছিলেন সাবেক এমপি ডা. ইকবাল। সে ঘটনায় মানুষ মারা গেলেও ইকবালের কোনো সাজা হয়নি। 
মোহাম্মদপুরের এমপি হাজী মকবুল সাইন্সল্যাবরেটরি মোড়ে বিএনপির মিছিলে গুলি করেছিলেন। 
 
ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের এমপি ক্যাপ্টেন (অব.) গিয়াস উদ্দিন তার নিজ দলের সমর্থকদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করেন।যা ছবিসহ ফলাও করে প্রচার হয়েছে। তিনি প্রকাশ্যে সচিবালয়ের কর্মকর্তাকে হত্যারও হুমকী দিয়েছিলেন।গিয়াসের কিছু হয়েছে বলে জানা যায়নি। 
 
নোয়াখালী-৪ আসনের এমপি একরামুল করিম চৌধুরী ১৮ দলের মিছিলে গুলি করেন। 
  
কক্সবাজার-৪ আসনের এমপি আবদুর রহমান বদি অবরোধকারীদের ওপর প্রকাশ্যে গুলি করেছেন। বদির বিরুদ্ধে ইয়াবা বাণিজ্যসহ শত অভিযোগ রয়েছে। অথচ তিনি সংসদ সদস্য পদে বহাল আছেন।  
 
সর্বশেষ গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি মনজুরুল ইসলামের গুলিতে এক শিশু আহত হয়। লিটনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এ ধরণের ঘটনা তিনি আগেও ঘটিয়েছেন। রাতে না ঘুমিয়ে তিনি দিনে ঘুমান। আর রাতে পাজেরো নিয়ে ঘুরে বেড়ান। বেশিরভাগ সময় মাতাল থাকেন। এধরণের চরিত্রের একজন মানুষ আওয়ামী লীগের মতো একটি জনসম্পৃক্ত সংগঠনের ব্যানারে সংসদ সদস্য হলেন কিভাবে? সেটাই বড় প্রশ্ন।
 
এমপিদের বিরুদ্ধে গুলি ছাড়াও আরো নানা অভিযোগ বিগত দিনে পাওয়া গেছে। নিজের হাতে আইন তুলে নেয়ার ঘটনা ঘটছে। পটুয়াখালীর গলাচিপা থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন গোলাম মাওলা রনি। একটি বেসরকারি টেলিভিশনের দুই সাংবাদিককে পিটিয়ে জেলও খেটেছেন।
 
কলেজ চত্বরের গাছ কাটার অভিযোগে রানীশংকৈল মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষকে চড় মারেন ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের এমপি হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। 
ট্রেনে ডিলাক্স রুমের টিকিট না পাওয়ায় স্টেশন মাস্টার আবদুর রশিদকে মারধর করেন পাবনা-৪ আসনের এমপি শামসুর রহমান শরীফ ডিলু। একই দিনে তিনি সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনের প্রহরী আমির আফজাল আলীকেও প্রহার করেন। 
 
রাস্তার উন্নয়নের জন্য ডিও লেটার চাওয়ায় জামালপুর-৪ আসনের সাবেক এমপি ডাক্তার মুরাদ হাসানের হাতে প্রহৃত হন আওয়ামী লীগ নেতা আইনজীবী বদরুদ্দোজা বাহাদুর। আর এই মারধরের ঘটনায় নিজ দলের কর্মীদের হাতে লাঞ্ছিত হন সরকার দলীয় এই এমপি। 
 
আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে খুনের মামলা গ্রহণ করায় শার্শা থানার ওসি এনামুল হককে মারধর করেন যশোর-১ আসনের এমপি আফিল উদ্দীন। 
 
ঠিকাদাররা এমপির সঙ্গে যোগাযোগ না করায় সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ শাহজাহানকে বাসায় ডেকে নিয়ে মারধর করেন ঝিনাইদহ-২ আসনের সরকারদলীয় এমপি শফিকুল ইসলাম অপু।
 
এমপির নামের জায়গায় ভুল করে অন্যের নাম উচ্চারণ করায় দক্ষিণ সুরমা সিলাম নবারুণ উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক ফখরুল ইসলামকে লাঞ্ছিত করেন সিলেট-৩ আসনের এমপি মাহমুদ-উস-সামাদ চৌধুরী।
 
খুলনা-১ আসনের এমপি ননী গোপাল মন্ডলকে অতিথি না করায় তার হাতে দাকোপ উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান জয়ন্তী রানী সরদার লাঞ্ছিত হন। 
 
পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ না দেয়ায় বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশিদকে নাজেহাল করেন বরিশাল-২ আসনের সাবেক এমপি মনিরুল ইসলাম মনি। 
 
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ক্যাম্পাসে চাকরির কোটা দাবি করে অনুষ্ঠিত লাঠি মিছিলে নেতৃত্ব দেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ভাতিজা ও রংপুর-১ আসনের এমপি হোসেন মকবুল শাহরিয়ার। সে সময় তাদের সঙ্গে হাসপাতাল কর্মচারীদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। 
 
শুধু আইন প্রণেতারাই নন। আইন প্রণেতাদের ছেলে-মেয়ে আত্মীয় স্বজনের  বিরুদ্ধেও গুলি করে মানুষ হত্যাসহ নানা ধরণের অভিযোগ বিগত দিনে পাওয়া গেছে। সম্প্রতি এমপি পিনু খানের ছেলে বখতিয়ার আলম রনি  গুলি করে দুজনকে হত্যা করে জেলে আছেন।
 
মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার জামাতা কর্নেল তারেক সাইদ মোহাম্মদ নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় জেলে আছেন।  এর আগে মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের ছেলে সুমু গ্রেফতার হয়েছেন গাড়িতে একে ৪৭ সহ। 
 
লালমনিরহাটে পাওনা টাকা চাওয়ায় বৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা নুরনবী নামের এক কাঁচামাল ব্যবসায়ীকে ঘরে আটকিয়ে রেখে পেটান সাবেক সাংসদ জাপা নেতা জয়নাল আবেদীনের ছেলে বিএনপি নেতা সায়েদুজ্জামান কোয়েল।
 
যশোরের শার্শা থেকে নির্বাচিত বিএনপি দলীয় সাবেক এমপি আলী কদরের পুত্র নোমান ও ডাকাত সর্দার তবির নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী গয়ড়া মোশারেফের ভাই জাহিদুল ও মোশারেফের স্ত্রী রেবেকাকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে বড়আচড়া কদর ভবনে একটি অন্ধ কুপে নিয়ে জমি লিখে দেওয়া ও চাঁদার দাবিতে ২দিন আটকে রাখে। এক পর্যায়ে কৌশলে তারা পালিয়ে যান।  
 
বিএনপি আমলে হাওয়া ভবন সিন্ডিকেটের সদস্যদের মধ্যে সাবেক পাটমন্ত্রী শাজাহান সিরাজের পুত্র রাজিব সিরাজ অপু, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর পুত্র আবিদ হাসান, বন ও পরিবেশমন্ত্রী তরিকুল ইসলামের পুত্র অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, সাংসদ এমএ হাসেমের পুত্র ফয়সাল মোর্শেদ খান ও মেজর (অব.) কামরুল ইসলামের পুত্র তানভীর ইসলাম। এরা সবাই জোট সরকারের পাঁচ বছর হাওয়া ভবনের ব্যানারে চুটিয়ে ব্যবসা করেছেন। সেসময়ে নানা অপকর্মের অভিযোগ ছিল তাদের বিরুদ্ধে। 
 
এছাড়া মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন মায়ার পুত্র দীপু, বিএনপির প্রয়াত মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের পুত্র পবন, তাহের পুত্র বিপ্লবের কাহিনী দেশবাসি সবাই জানেন। 
এখন আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন যেটি সেটা হলো এইযে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন এলাকার সংসদ সদস্য ও তাদের পুত্ররা বিভিন্ন অপকর্ম করেছেন ও করছেন। তাদের বিগত দিনে কোনো শাস্তি হয়নি।হলেও অনেকে পার পেয়ে গেছেন। তাহলে দেশে কি এভাবেই ক্ষমতাসীনদের হাতে সাধারণ মানুষ নির্যাতিত হতে থাকবে? 
 
সর্বশেষ মন্জুরুল ইসলামসহ আগে যেসব ঘটনা ঘটিয়েছেন, তা ফৌজদারি অপরাধ। সংসদ সদস্য বা আইনপ্রণেতা হিসেবে এদের ছাড় পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। 
 
আমরা আশা করব, আইন নিজস্ব গতিতে চলবে। এমপি বলে কেউ দিনের পর দিন নানা অপকর্ম করে পার পাবেন তা হবে না। আবার তাদের পুত্র-কন্যা কিংবা স্ত্রী হলেও তাদের ছাড় দেয়া যাবে না। সবাইকেই আইনের আওতায় আনতে হবে। নিতে হবে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। তাহলে দেশে অপরাধের সংখ্যা অনেক কমে আসবে।   
 
সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (২য় তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১১৯২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2019 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com