টাকাই আমার পেছনে ছুটবে: ইকরাম

টাকাই আমার পেছনে ছুটবে: ইকরাম
প্রকাশ : ২৫ অক্টোবর ২০১৫, ১২:১৪:২৬
টাকাই আমার পেছনে ছুটবে: ইকরাম
প্রিন্ট অ-অ+

অনলাইন ফ্রিল্যান্সিংয়ে হাতে খড়ি ২০০৪ সালে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিষয় নিয়ে মাস্টার্স  সম্পন্ন করেন। পরে শুধু চাকরির আশায় না ঘুরে নিজের উদ্যোগে কিছু করার স্বপ্ন নিয়ে ঘরে বসে শুরু করেছিলেন অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ার। শুরুতে তেমন সফলতা না পেলেও অদম্য ধৈর্য, কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যবসায় বর্তমানে তাঁকে সফলতার দ্বারপ্রান্তে এনে দিয়েছে।

তিনি বাংলাদেশের তিনটি সেরা আইটি ব্লগের মধ্যে জেনেসিসব্লগস.কমের প্রতিষ্ঠাতা। একজন সেরা আইটি ব্লগার এবং সফল ফ্রিল্যান্সার। বর্তমানে সিভিনটেকের চেয়াম্যান।


শনিবার দুপুরে রাজধানীর পান্থপথের ফিরোজ টাওয়ারে সিভিনটেকের অফিসে  বিবার্তা২৪.নেটের  প্রতিবেদক উজ্জ্বল এ গমেজের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।


ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ার শুরুর গল্প, সাফল্য ও ব্যর্থতার কথা, ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হয় তাঁর সঙ্গে।



বিবার্তা২৪.নেটঃ  ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ার শুরুর গল্পটা বলুন?


মো. ইকরামঃ আমার ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ার শুরুর গল্পটা ততটা ভাল ছিল না। প্রথমে আমার এক সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বন্ধুর সাথে একটা আইটি ব্যবস্যা শুরু করি। কিছুদিন ভাল চলতে থাকে। এক সময় তার সাথে একটা সমস্যা হয়। আর সে আমাকে একটা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। ওই চ্যালেঞ্জটাই আমাকে আইটি জগতে কাজ করতে মাইলফলক হয়ে দাঁড়ায়। সত্যি কথা বলতে কি আমার আসলে জানাই ছিল না যে গ্রাফিক্স ডিজাইন শেখার মাধ্যমে ইনকামে যাওয়া যায়।

এটা শুধু জানতাম গ্রাফিক্স শিখে অনেক মজার মজার কাজ করা যায়। আয় করার উদ্দেশ্য নয়, এই শিল্পটিকে জানা ও বোঝার জন্য এই ভুবনে আমার পদচারণা। ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ার গড়ার শুরুতে আমার একটা লক্ষ্য ছিল টাকার জন্য আমি ফ্রিল্যান্সিং কাজ শিখব না। আমি শিখব জানার জন্য। নিজেকে দক্ষ করে তৈরি করার জন্য। আমি নিজে দক্ষ হলে টাকা আমার পেছনে ছুটবে।



বিবার্তা২৪.নেটঃ এতো পেশা থাকতে সামাজিক নেটওয়ার্কিং সাইটের মাধ্যমে আয়-এ বিষয়টিকে বেছে নিলেন কেন?


মো. ইকরামঃ  ফ্রিল্যান্সিং পেশাটা আগে যেমন সহজ ছিল এখন কিন্তু এত সহজ না। এখন একটা বড় চ্যালেঞ্জিং পেশা। ১৯৯৯ সালে আমি যখন কম্পিউটার ব্যবহার করা শুরু করি তখন অনলাইনে দেখতাম নেটওয়ার্কিং, হার্ডওয়্যার, ফেসবুকিং, ইমেইলিং, ফ্রিল্যান্সিং করে। তখন আমার মনে কৌতুহল হতো কে করে এগুলো? কীভাবে করে? আমার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে।

তখন থেকেই আমি মনে মনে স্থির করি আমিও এই জগতে কাজ করব। তখন আমার এক ফ্রেন্ডকে এ ব্যাপারে বললে ও  এসে আমাকে কিছু কাজ দেখায়। আমি দেখি এসব কাজে অনেক সৃজনশীলতা আছে। সে আমাকে কিছু কাজ শেখায়। বেশ ভালই লাগে। আর সৃজনশীলতা সব সময়ই আমাকে বেশি টানতো। আমি ভাবলাম এখানে কাজ করলে আমার সৃজনশীলতা দেখানোর সুযোগ আছে।



বিবার্তা২৪.নেটঃ আপনি কোন  ধরনের কাজ করেন?  

টাকাই আমার পেছনে ছুটবে: ইকরাম


মো. ইকরামঃ প্রথমে আমি ওয়েবসাইট ডেভেলপিং কাজ দিয়ে শুরু করি। দেশের বাইরে থেকে প্রজেক্ট আনার কাজটা আমাকেই করতে হতো। তখন ভাবলাম আমার একার পক্ষে তো এই কাজ করা সম্ভব না। একটা টিম তৈরি করলাম। আমি দেশের বাইরে থেকে প্রজেক্ট এনে দিলে টিম সেই কাজ করবে আর আমাদের সবার ভালমতো চলবে। এর পরে আমি শুরু করি এসইও এর কাজ। এছাড়াও ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব ইত্যাদি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে আমার ক্লায়েন্টদের ব্যবসাকে প্রসারিত করার কাজসহ অন্যান্য কোম্পানির পণ্যসহ নানা প্রমোশনাল কাজ করতেশুরু করি।


         
বিবার্তা২৪.নেটঃ এই কাজে আপনার প্রতি মাসে কত আয় হয়?


মো. ইকরামঃ প্রতি মাসে আয় বলতে আসলে এটা নির্ভর করে আমি কতটুকু সময় অনলাইনে দেই তার ওপরে এবং ক্লাইন্ট পাওয়ার ওপরে। তবে প্রথম যখন শুরু করেছিলাম তখন প্রতিমাসে ১০০০/১৫০০ ডলার আয় করতাম। পরে চিন্তা করলাম আমি এই আয়টাকে আরো বড় পর্যায়ে  নিয়ে যেতে চাই। তাহলে এই কাজ তো আমার একার পক্ষে সম্ভব না।

একটা বড় টিম দরকার। বড় টিম হলে দেশের বেকার যুবকদের একটা কাজের  জায়গা হলো। সেই উদ্দেশ্যকে সামনে নিয়ে কাজ শুরু করি। আর এখন আমার মাসিক আয় হচ্ছে ৫ হাজার ডলার।  আশা করছি আগামী মে/জুন মাসে আমার মাসিক আয় হবে ২০ হাজার ডলার। আগে শুরু করেছি আমি একা। এখন সিভিনটেক কোম্পানি দিয়ে কাজ করছি।



 বিবার্তা২৪.নেটঃ  ফ্রিল্যান্সিং  কাজ করতে গিয়ে তিক্ত বা মজার কোনো ঘটনা যদি থাকে।


মো. ইকরামঃ ফ্রিল্যান্সিং কাজ করতে গিয়ে অনেক তিক্ত এবং আনন্দের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছি।  আমার জীবনের সব থেকে মজার এবং সুখের অভিজ্ঞতা হলো প্রথম লেখা প্রকাশের সময়। আমি আগে থেকে ব্লগে লেখালেখি করতাম।
জেনেসিসব্লগস.কম নামে আমার একটা নিজস্ব আইটি ব্লগ আছে। এখানে ফ্রিল্যান্সিং নিয়ে আইটির ওপর নিয়মিত লিখতাম।
২০১২ সালে ডুল্যান্সারের খুব খারাপ অবস্থা দেখা দেয়। তখন দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় আইটি পাতায় ডুল্যান্সারের ওপর লেখার জন্য অনুরোধ করে। তখন আমি ডুল্যান্সার নিয়ে আমার দেশ পত্রিকায় অনলাইনে ধারাবাহিকভাবে একশ পর্বের আর্টিক্যাল লেখা শুরু করি। আমার লেখাগুলো যখন পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ পায় তখন দেশের বিভিন্ন উচ্চ মহল থেকে শুরু করে অনেকে আমাকে ফোন করে প্রশংসা করতে থাকেন। এটা আমার জীবনের একটা বড় প্রাপ্তি। অনেক সুখের অভিজ্ঞতা। ওই অভিজ্ঞতাই আমাকে এই জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে। তবে ২৮টা পর্ব লেখার পরে আমার দেশ পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।



বিবার্তা২৪.নেটঃ আপনার সাফল্যের পেছনে কারণ কী?


মো. ইকরামঃ আমি শুরু থেকেই এই বিশ্বাসটা নিয়ে আমার এই ক্যারিয়ারের যাত্রা শুরু করি যে, টাকার পেছনে আমি ছুটব না। আগে নিজেকে দক্ষ করব তাহলে টাকাই আমার পেছনে ছুটবে। সেই জায়গাটা তৈরি করার জন্য শুধু স্বপ্ন দেখলেই হবে না। আমাকে প্রচুর পরিশ্রম করতে হবে।


পরিশ্রমের একটা উদাহরণ দিতে চাই। প্রতিদিন রাত ১০টাতে কম্পিউটারে বসে কাজ শুরু করতাম। সকাল ৯টাতে ঘুমাতে যেতাম। এরমধ্যে দিয়ে একবারের জন্য যাতে উঠতে না হয়, সেজন্য পানির বোতল নিয়ে বসতাম। এ অবস্থাতে চলতে গিয়ে একসময় অসুস্থ হয়ে পড়ি। তখন ৩ মাস  বেড রেস্টে চলে যেতে হয়েছিল।


সেই সময় ঘরের মধ্যেও ২জনের কাঁধে ভর করে চলতে হয়েছে কয়েকদিন। তখন নানাভাবে টাকার উপার্জন করার সুযোগ ছিল। কিন্তু আমি যদি টাকার পেছনে ছুটি তাহলে তো আর আমার ক্যারিয়ারের সফলতা আসবে না। আগে নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তুলি তাহলে টাকাই আমার পেছনে ছুটবে। আর আজ তাই হচ্ছে।


ওই লক্ষ্য আর পরিকল্পনাকে সামনে নিয়ে অনেক পরিশ্রম করেছি। আর সেই পরিশ্রমের ফল আজ এই সিভিনটেক প্রতিষ্ঠান। তাহলে বলবো সবার সহযোগিতা, নিজের ওপরে আত্মবিশ্বাস, ধৈর্য আর কঠোর পরিশ্রমই আমার এই সফলতার মূল কারণ।
টাকাই আমার পেছনে ছুটবে: ইকরাম


বিবার্তা২৪.নেটঃ  ফ্রিল্যান্সিং এ  ক্যারিয়ার গড়ার জন্য কি কি যোগ্যতা দরকার হয়?


মো. ইকরামঃ  কিছু হাতের কাজ শিখলাম, নেটে বসে ডেস্কটপে কাজ করলাম, আর আমার টাকা চলে আসবে। কাজটা এমন না। এই কাজটার ফল যে ২ দিনের মধ্যে পেয়ে যাব এই চিন্তাটা মাথায় আনা উচিত না। প্রথমে একজন ফ্রিল্যান্সারকে মনে রাখতে হবে, একটা কাজ করলাম এর ফল আজ হতে পারে বা ৫ মাস পরেও হতে পারে। কিন্তু হতাশ হলে চলবে না। একজন ফ্রিল্যান্সারের মনের মধ্যে এই ধৈর্যটুকু থাকতে হবে। ক্লাইন্টদের সাথে ভাল যোগাযোগ রক্ষা করার জন্য ভাল ইংরেজি জানতে হবে। এতে করে কাজের ক্ষেত্রে অনেক সুবিধা।



বিবার্তা২৪.নেটঃ  এ পেশার চ্যালেঞ্জগুলো কী কী?


মো. ইকরামঃ ফ্রিল্যান্সিং নামটি যত সহজ মনে হয়, আসলে কাজের ক্ষেত্রে ততটা নয়। এটি একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা। প্রতিদিন প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হয়। যেমন-প্রজেক্টে বিড করা, কাজের মূল্য ও সময় নির্ধারণ করা, যোগাযোগ রক্ষা করা, কাজের মান ঠিক রেখে সঠিক সময় সঠিক কাজটি ডেলিভারি দেয়া, বায়ারকে সন্তুষ্ট করা-প্রতিটি ক্ষেত্রই একেকটা চ্যালেঞ্জ। তাছাড়া এখন ফ্রিল্যান্সিং কাজেই রয়েছে তুমুল প্রতিযোগিতা। সফল হওয়াটাই এখন চ্যালেঞ্জের। আর বিশেষ করে আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষই ইংরেজিতে দুর্বল। ইংরেজি না জানলে সফলভাবে কাজ করা সম্ভব না।



বিবার্তা২৪.নেটঃ  বাংলাদেশের যারা অনলাইনে আয় করতে ইচ্ছুক, তাদের জন্য কিছু বলুন।


মো. ইকরামঃ যারা অনলাইনে কাজ করতে চান তাদের উদ্দেশে আমি বলব যে, এ পেশায় বাংলাদেশ আজ বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। বড় বড় প্রতিষ্ঠান আজ বাংলাদেশকে তাদের পছন্দের তালিকায় স্থান দিচ্ছে। এটি একটি বড় অর্জন। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এ অর্জনটিকে ধরে রাখতে পারলে ও বাস্তবে পরিপূর্ণভাবে রূপ দিতে পারলে বাংলাদেশে আর কোনো বেকার সমস্যা থাকবে না। আর যখন একজন ফ্রিল্যান্সার টাকার নেশায় দৌড়াবে সে কিন্তু সফল হতে পারবে না। আমি তাদের বলব আগে নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তুলুন তারপর টাকাই আপনার পেছনে দৌড়াবে।


কাজে দক্ষ হতে হবে। এ বিষয়ে ভালভাবে জানতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই। আপনি যদি ভাল কাজ জানেন আপনার সফলতা আসবেই। কিন্তু কোনরকম বা অল্প কাজ জানা ব্যক্তিরা কখনোই এখানে তাদের ক্যারিয়ারকে দীর্ঘ করতে পারবেন না।  ধৈর্য শক্তি এবং আত্মবিশ্বাসের বিকল্প নেই। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন বিষয় জানার, শেখার একটা অদম্য আগ্রহ্য থাকতে হবে।  ইংরেজি স্কিলটা ভাল হতে হবে। ইন্টারনেট ব্রাউজ করার জ্ঞান থাকতে হবে।


বিবার্তা২৪.নেটঃ  মূল্যবান সময় দেয়ার জন্য বিবার্তা২৪.নেটের পক্ষ থেকে আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

 


মো. ইকরামঃ  আপনাকেও ধন্যবাদ। আপনার মাধ্যমে বিবার্তার সকল পাঠকসহ সবাইকে ধন্যবাদ।



বিবার্তা/উজ্জল/মহসিন

 

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (২য় তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১১৯২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2019 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com