‘সন্ধ্যার প্রতিঘন্টায় আয় ১০ ডলার’

‘সন্ধ্যার প্রতিঘন্টায় আয় ১০ ডলার’
প্রকাশ : ১৪ নভেম্বর ২০১৫, ২২:০০:৩৮
‘সন্ধ্যার প্রতিঘন্টায় আয় ১০ ডলার’
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+
ঢাকার মেয়ে সন্ধ্যা রায়। তিন ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয় তিনি। ঢাকা সিটি কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন করেছেন কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে। তখন থেকেই কিছু একটা করবেন এমন একটা তাড়না ছিল মনের মধ্যে। ২০১১ সালের শেষের দিকে ফ্রিল্যান্সিং কাজে হাতেখড়ি হয় সন্ধ্যা রায়ের। শুরু করেন ডাটা এন্ট্রির কাজ দিয়ে। এর পরে করেন ওয়েব ডেভেলপমেন্ট এবং সফটওয়্যার কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্সের কাজ। ২০১২ সালে প্রথম তিনি লোয়ক নামের একটি কোম্পানির কাজ পান। সেটা ছিল মাত্র পাঁচ ডলারের। এরপর শুরু পথ চলা। এখন প্রতি ঘণ্টায় তিনি আয় করেন ১০ ডলার।
 
সম্প্রতি ফ্রিল্যান্সার হিসেবে আউটসোর্সিং করে নিজের জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি যারা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন তাদের উৎসাহ দিতে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) পঞ্চমবারের মতো দিয়েছে ‘বেসিস আউটসোর্সিং অ্যাওয়ার্ড ২০১৫’। বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে দেশ সেরা ৯৪ ফ্রিল্যান্সার ও আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কৃত করা হয়। এবার দেশসেরা ফ্রিল্যান্সারের মর্যাদা পেয়েছেন তিন নারী। সন্ধ্যা রায় তাদের মধ্যে একজন।
‘সন্ধ্যার প্রতিঘন্টায় আয় ১০ ডলার’
রাজধানীর রামকৃষ্ণ মিশন রোডের গোপিবাগে নিজ বাসায় বিবার্তা২৪.নেটের প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। এবারের আউটসোর্সিং প্রতিযোগিতায় সেরা হয়ে ওঠার গল্প নিয়ে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন বিবার্তা২৪.নেটের নিজস্ব প্রতিবেদক- উজ্জ্বল এ গমেজ।
বিবার্তা২৪.নেটঃ এত ক্যারিয়ার থাকতে ফ্রিল্যান্সিংকে বেছে নিলেন কেন?
 
সন্ধ্যা রায়ঃ সবাই স্বাধীনভাবে কাজ করতে চায়। আমিও তাই চাই। আমার যেটা অভিজ্ঞতা সেটা হলো এখানে স্বাধীনভাবে, নিজের ইচ্ছে মতো কাজ করা যায়। কতটুকু কাজ করব, কত ঘন্টা কাজ করব সবই নিজের স্বাধীনতায় করি। কেউ কিছু বলার নাই। তাছাড়া একজন নারী হিসেবে আমাকে ঘরেও অনেক কাজ করতে হয়। আছে অন্যান্য সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের চিন্তা। আউটসোর্সিং এ আমি আমার মতো করে, আমার সময়মত কাজগুলো করতে পারি এবং এখানে আয়ের পরিমাণও অনেক বেশি।
 
বিবার্তা২৪.নেটঃ এই কাজ করার অনুপ্রেরণা পেলেন কীভাবে?
 
সন্ধ্যা রায়ঃ পড়াশুনা শেষ করে আমাকে কিছু একটা করতে হবে এবং আমাকে নিজে নিজে আত্মনির্ভরশীল হতে হবে, মূলত এই চিন্তা থেকে আউটসোর্সিং আসা। প্রতিবেশী এবং সংবাদপত্র থেকে এই আউটসোর্সিং বিষয়ে অনেক কিছু জানতে পারি। এরপর ২০১১ এর মাঝামাঝি থেকে আপ-ওয়ার্ক (Upwork) এ কাজ শুরু করি। এইক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা দিয়েছে আমার স্বামী এবং আমার পরিবার। অবশেষে বেসিস এর এই পুরস্কার আমকে আরও সামনে এগিয়ে নিতে অনুপ্রেরণা যোগাবে। ধন্যবাদ বেসিস কে এই সম্মাননার জন্য।
 
বিবার্তা২৪.নেটঃ আপনি এখন কী করছেন?
 
সন্ধ্যা রায়ঃ এখন আমি লোয়ক (LoYakk) সফটওয়্যার কোম্পানির রিলিজ ম্যানেজার হিসেবে স্থায়ীভাবে কর্মরত আছি। কোম্পানিটি ওয়েবসাইট কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স এবং  আইফোনের বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন, মোবাইল নেটওয়ার্ক কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স নিয়ে কাজ করে। এন্ড্রয়েড ও আইফোনের বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন এবং সেখান প্রতিটি ভার্সন এর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে সেটা আমাকে ক্লায়েন্ট এর কাছে পাঠাতে হয়। এ সব কাজ আমাকে দেখাশুনা করতে হয়।
 
বিবার্তা২৪.নেটঃ এই কাজ করতে গিয়ে জীবনের কোন মজার ঘটনা যদি থাকে?
‘সন্ধ্যার প্রতিঘন্টায় আয় ১০ ডলার’
সন্ধ্যা রায়ঃ কাজ করতে গিয়ে তো নানা ধরণের ঘটনা ঘটে থাকে। একবার একটি আউটসোর্সিং কাজের ইন্টারভিউ এর সময় একজন ক্লায়েন্ট কিছুই জানে না এমন ভাব ধরে আমাকে নানা প্রশ্ন করতে থাকে। তিনি ছিলেন আসলে একজন সফটওয়্যার আর্কিটেক্ট। ইন্টারভিউ শেষ কিছুই বুঝতে পারি নাই। পরে  যখন আমি তার সাথে কাজ করতে শুরু করি তখন জানতে পারি তিনি একজন সফটওয়্যার আর্কিটেক্ট। বিষয়টা আজও আমি অনেক এনজয় করি।
 
বিবার্তা২৪.নেটঃ আপনার এ সাফল্যের কারণ কী?
 
সন্ধ্যা রায়ঃ ধৈর্য এবং ধৈর্য। আউটসোর্সিং এমন একটা ক্ষেত্র এখানে একজন ফ্রিল্যান্সারকে ধৈর্য নিয়ে কাজে লেগে থাকতে হয়। এরপর যেটা প্রয়োজন সেটা হলো শেখার ও জানার আগ্রহ। আমাদের দেশে যারা একবারে নতুন ফ্রিল্যান্সার আমি মনে করি তাদের ধৈর্য অনেক কম। তাই তারা অল্পতেই হতাশ হয়। আমি মনে করি আমার সাফল্যের মুলমন্ত্র হলো-ধৈর্য্, শেখার আগ্রহ আর আত্মবিশ্বাস।
 
বিবার্তা২৪.নেটঃ আপনার সাফল্যের পেছনে কার অবদান সবচেয়ে বেশি বলে মনে করেন?
 
সন্ধ্যা রায়ঃ প্রত্যেক সফল ব্যক্তির জীবনে সফল হওয়ার পেছনে কারো না কারো বিশেষ অবদান থাকে। আমি বিবাহিতা নারী। আমার এক বছরের একজন ছেলে স্বপ্লিল সাহা। আার আমার স্বামী সুমন সাহা। এই নিয়ে আমার ছোট পরিবার। নারীদের পরিবারে থেকে সব কাজ করে আবার রাত জেগে আউটসোর্সিং কাজ করা অনেক চ্যালেঞ্জের। এটা আমার পক্ষে সম্ভব হতো না যদি আমার স্বামী আমাকে সব দিক থেকে সাপোর্ট না করতো। এ কাজে আসার জন্য আমাকে পরিবার সবচেয়ে বেশি সমর্থন করেছে। আমার এই সাফল্যের পেছনে পরিবারের অবদান সবটুকু।
 
বিবার্তা২৪.নেটঃ ফ্রিল্যান্সিং কাজ করতে গিয়ে আপনি কী ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন?
‘সন্ধ্যার প্রতিঘন্টায় আয় ১০ ডলার’
সন্ধ্যা রায়ঃ প্রথমত নিরবিচ্ছন্ন ইন্টারনেট এবং নিরবিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ। আসলে আমাদের দেশে সবকিছু নিয়েই ভয় এবং ইন্টারনেট নিয়েও এক ধরণের ভয় ছিল এক সময় যে ইন্টারনেট আসলে বুঝি বাংলাদেশের সব তথ্য পাচার হয়ে যাবে। ঢাকায় ইন্টারনেট এর গতি ভালো হলেও ঢাকার বাইরে গেলেই তেমন নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। আপলোডের ক্ষেত্রে এই গতি আরও কমে যাচ্ছে। ইন্টারনেটের গতি কম হলে আমরা বেশ অসুবিধায় পড়ি। পেপাল হলে খুব সহজেই দেশে টাকা আনা যেত। অনেক ক্লায়েন্ট ই-পেপাল একাউন্ট আছে কিনা জানতে চাই আর তখন আমাদের কষ্টের সাথে বলতে হয় ‘সরি পেপাল ইস নট সাপোর্টেড ইন বাংলাদেশ’।
 
বিবার্তা২৪.নেটঃ দেশের ফ্রিল্যান্সিংকে নিয়ে আপনার ভবিষৎ স্বপ্ন কী?
 
সন্ধ্যা রায়ঃ আমি এখন চেষ্টা করছি এ কাজে আরও কিছু ফ্রিল্যান্সারদের যুক্ত করতে যাতে আরও কর্মসংস্থান তৈরি হয়। ভবিষ্যতে আমার ইচ্ছা তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর উদ্যোক্তা হয়ে বড় পরিসরে কিছু করার এবং পাশাপাশি আমি নতুনদের প্রশিক্ষণ দিতে চাই। আমি স্বপ্ন দেখি আগামী দুই বছরের মধ্যে আমার প্রতিষ্ঠানে ২০০ এর অধিক লোকের কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
 
বিবার্তা২৪.নেটঃ আপনার মূল্যবান সময় দেয়ার জন্য আমাদের বিবার্তা২৪.নেট পরিবারের সকলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।
 
সন্ধ্যা রায়ঃ আপনাদের অনলাইন নিউজ পোর্টালের মাধ্যমে আমার এই সাফল্যের গল্প পাঠকদের কাছে তুলে ধরার জন্য আপনাদের সকলকে অনেক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
 
বিবার্তা//দ্বীপ//মাজহার
 
সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (২য় তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১১৯২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2019 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com