মুনাফা বনাম জাতীয় নিরাপত্তা

মুনাফা বনাম জাতীয় নিরাপত্তা
প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৬, ০৯:৪১:০৫
মুনাফা বনাম জাতীয় নিরাপত্তা
খাদীজা আক্তার
প্রিন্ট অ-অ+
বাংলাদেশ তার জন্মলগ্ন থেকেই মতামত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সাংবিধানিকভাবে গ্যারান্টি প্রদান করেছে। সংবিধানের ৩৯ নং ধারায় সুষ্পষ্টভাবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, স্বাধীন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করেছে। আর এদেশের মানুষ তা চর্চাও করছে যার ফলস্বরূপ দেশে চার হাজারেরও বেশি পত্রিকা রয়েছে, ২৮টি টিভি চ্যানেল, রয়েছে এফ এম রেডিও, কমিউনিটি রেডিও, ফেসবুক, টুইটার ইত্যাদি অসংখ্য গণমাধ্যম। শুধু সংখ্যাগত নয়, এসবের গুণগত চর্চাও হচ্ছে। সংবাদ ও তথ্যের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। শুধু উচ্চ শিক্ষিতরাই নয়, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার চর্চা চলছে সকল পর্যায়েই। ফলে গণমাধ্যম এখন অনেক বেশি Interactive হয়ে পড়েছে। তথ্যের  অবাধ প্রবাহ, তথ্য জানা ও পাওয়ার অধিকার নিশ্চিতে আইন করা হয়েছে, আইনের বাস্তবায়নে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়েছে যেটি উদ্দীষ্ট লক্ষ্যে পৌছাতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
 
ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে একটি ডিজিটাল বিভেদহীন ও উন্নত সমৃদ্ধ দেশে রূপ দিতে সরকার তৃণমূল পর্যায় থেকে কেন্দ্র অবধি ইন্টারনেটের বিস্তৃতি ঘটিয়েছে। দ্রুত ও সহজে ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করতে অপটিক্যাল ফাইবারের সংযোগ যাচ্ছে প্রতিটি ইউনিয়নে। ১১ কোটি মোবাইল গ্রাহকের সংখ্যাই বলে দিচ্ছে হাতে হাতে ইন্টারনেট পৌঁছানো আর বেশি দেরি নয়। সরকার শুধু ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, একটি দক্ষ ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সমন্বিত বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে এ ডিজিটালাইজেশনের প্রক্রিয়ায় সকলকে সম্পৃক্তকরণের মধ্যদিয়ে। এমনকি সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায় থেকে বাস্তবায়ন পর্যায় পর্যন্ত সকলকে উৎসাহিত করা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে, এজন্য যে, এতে সমস্যার দ্রুত সমাধান, উদ্ভাবন, সেবার সহজীকরণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়, দেশ একটি মজবুত ভিত্তির ওপর দাড়িয়ে উন্নয়নের দিকে ধাবিত হতে পারে। আর এ জনসম্পৃক্ততার সাথে সাথে যে বিষয়টি চলে আসে তা হল ‘নিরাপত্তা’।
 
তিন সপ্তাহের মতো সরকার ফেসবুক, হোয়াটস এপ, ভাইবার ও গুটিকয়েক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ রেখেছিল। এর আগেও একবার সরকার  নিরাপত্তার স্বার্থে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ রেখেছিল। সোশ্যাল মিডিয়া শুধু যোগাযোগ নয়, ব্যবসা, উদ্ভাবন, পারস্পরিক সহর্মমিতা, সমমর্মিতা, রাজনীতি তথা আর্থসামাজিক, রাজনীতিক ও মানবিক সকল দিকের সন্নিবেশ ঘটে এখানে। এদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর ৮০ ভাগেরই ফেসবুকে প্রবেশ রয়েছে বলছেন আইটি গবেষকরা।
 
আইটি বিশ্লেষকরা বলছেন, ফেসবুক বন্ধ থাকায় দেশের ৬টি মোবাইল কম্পানির দৈনিক ক্ষতি হয়েছিল প্রায় দেড়কোটি টাকা। ই-কর্মাসের বাজার বিশ্লেষকরা এখাতে দৈনিক ১ কোটি টাকার ক্ষতি নিরূপণ করেছেন। বলতে গেলে, ফেসবুক অনেকটা নেশার মত, ব্যবহারকারীরা তাই এর বন্ধে বেশি  বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখায়।     
 
 
গণমাধ্যমে চীন, ইরান, তুরস্কের মত বিভিন্ন দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ রাখার উদাহরণ দিয়ে এগুলোকে রাষ্ট্রের স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব হিসেবে আখ্যা দেয়া হচ্ছে। এমনকি এদেশে সাময়িকভাবে বিদ্যমান এ বন্ধ অবস্থাকেও অনেকে নানাভাবে বিশ্লেষণ ও সমালোচনা করছেন। কেউ সাধুবাদও জানাচ্ছেন যেমনটি ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর ফেসবুক বন্ধের বিষয়ে পত্রিকার দেয়া মতামতের ওপর একজনের বক্তব্য ছিল এরকম যে ৯/১১’র পরে মার্কিন সরকার তাৎক্ষণিকভাবে সব প্লেন চলাচল বন্ধ করে দেয় সাময়িকভাবে। এতে বিভিন্ন দেশের মিলিয়ন মিলিয়ন যাত্রীর অসুবিধা হয়। কিন্তু সবাই তা মেনে নেয়। নিরাপত্তার স্বার্থে তাই সাময়িকভাবে সোশাল মিডিয়ার কিছু অ্যাপস বন্ধ রাখার সরকারের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেছিলেন তিনি।
 
বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে, জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনে সরকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে পারে। ইন্টারনেট-কম্পিউটার জগতে যারা প্রতিনিধিত্ব করছে সেসব দেশও অনেক সময় বন্ধ রেখেছে। ইন্টারনেট নিরাপত্তার নানাকৌশল অবলম্বন করছে। একটির পর একটি এপ্লিকেশন তৈরি করছে। কিছু দেশ সরাসরি বন্ধ করছে, কোন দেশের সরকার উন্নত প্রযুক্তি দিয়ে আড়ি পাতছে, নজরদারী চালাচ্ছে গোপনে। 
 
তথ্যপ্রযুক্তি ও ইন্টারনেটে প্রথমসারিতে থাকা আমেরিকার সোশ্যাল মিডিয়া ও অন্যান্য ক্ষেত্রে  নজরদারির বিস্তৃতি কত ব্যাপক তা প্রায় সবাই অনুমান করতে পারে। বিশেষত উইকিলিকস ও প্রিজম কর্মসূচি এক্ষেত্রে সারাবিশ্বকে জানানোর  কাজটা করেছে। ভারত-রাশিয়ার আইটি খাত অনেক এগিয়ে। ভারত সরকার ইন্টারনেটের ইতিবাচক ব্যবহারে অনেকাংশেই সফল হয়েছে। চীন শুধু ফেসবুক ও অন্যান্য সোশাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণেই রাখছে না নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তৈরি ও জনপ্রিয় করে তুলছে।     
 
প্রকৃতপক্ষে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে যেকোন কল্যাণকামী রাষ্ট্রই গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল ইস্যুতে হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে। পুঁজিবাদি ও ভোগবাদী বিশ্বব্যবস্থায় রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ না থাকলে সেখানে ছোট দেশ হিসেবে জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা ও ব্যক্তিস্বার্থ বিঘ্নিত হতে বাধ্য। একটা কল্যাণরাষ্ট্রের সরকার যেমন সেবার সরবরাহ করবে, ব্যক্তি স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিবে তেমনি বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা রাখবে। সুবিধালোভী, স্বার্থান্বেষী মহল নতুবা এমন ছোবল  দিবে যা রাষ্ট্রযন্ত্রকে অচল করে দিতে পারে। ফেলে দিতে পারে দীর্ঘ অচলায়তনে।         
 
সরকার ইতোমধ্যে ফেসবুকের প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা করে সবার জন্য তা উন্মুক্ত করে দিয়েছে। একই সঙ্গে অন্যান্য অ্যাপসসমূহ সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া দেয়া হয়েছে। তাই জাতীয় স্বার্থকে ব্যক্তিগত ভাবাবেগের ঊর্ধ্বে নিয়ে সামষ্টিক নিরাপত্তায় সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে। সেইসাথে, এসবের অপব্যবহার রোধে সরকারের প্রযুক্তিগত ও অবকাঠামোগত নিজস্ব সামর্থ্য বাড়াতে হবে। সচেতন ব্যবহার নিশ্চিতে সকলকে দায়িত্বশীল ভূমিকা বাখতে হবে।  
 
সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (২য় তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১১৯২১৫১১১৫

Email: [email protected].com, [email protected]

© 2020 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com