সরকারি টাকা আমার, আমার টাকা তো আমারই!

সরকারি টাকা আমার, আমার টাকা তো আমারই!
প্রকাশ : ০১ মার্চ ২০১৬, ১০:৪৮:৫৫
সরকারি টাকা আমার, আমার টাকা তো আমারই!
হাবিবুর রহমান স্বপন
প্রিন্ট অ-অ+
জাতীয় সংসদে দেয়া তথ্যে জানা গেল সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের কাছে বকেয়া রয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা ভূমিকর, বিদ্যুৎ বিল ও টেলিফোন বিল। এছাড়াও সংসদের প্রশ্নত্তোর পর্বের কার্যবিবরণী থেকে জানা গেল গত তিন বছরে প্রায় তিন হাজার কেজি সোনা আটক হয়েছে।সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের পরিমাণ ৫ হাজার ৩’শ ৮১ কোটি টাকা, ভূমিকর বকেয়া ১ হাজার ৪’শ ৪৬ কোটি টাকা। টেলিফোন বিল বাকি আছে প্রায় ৮’শ কোটি টাকা। জানা গেল গত তিন বছরে বিমানবন্দরে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগসহ সরকারি আইন-শৃংখলা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছে ২ হাজার ৯’শ ৪৪ কেজি সোনা।
 
সরকারি অর্থ যা লেনদেন-এর বিষয়, সেগুলো করে থাকেন সরকারি লোকজন বা সরকারি কর্মচারিরা। তারা কি তাহলে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন না? না করে থাকলে তার কারণ অনুসন্ধান করতে হবে। মনে রাখতে হবে, সরকার হচ্ছে একটি ট্রাস্ট আর সরকারের কর্মচারিরা ট্রাস্টরক্ষক এবং উভয়েই জনগণের কল্যাণের জন্য সৃষ্ট। দার্শনিক প্লেটো বলেছেন, ‘মানুষের যেমন রাষ্ট্র, তেমনি মানুষের চরিত্রের মধ্য থেকেই রাষ্ট্র গড়ে ওঠে।’
 
সরকারি অর্থ হচ্ছে জনগণের অর্থ। তার আমানতকারী সরকারি কর্মকর্তাগণ। তারা যদি সেই অর্থ-সম্পদ রক্ষা না করে নিজেরাই লুটপাটে ব্যস্ত থাকেন তা হলে দেশ চলবে কি করে? জনগণের কল্যাণই বা হবে কেমন করে? রাষ্ট্র মানুষের। জনগণের চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ রাষ্ট্র। দার্শনিক প্লেটোর ফর্মুলানুসারে বিশ্লেষণ করলে প্রতিটি দেশের মানুষের চরিত্রের রূপ পরিস্কারভাবে জানা যাবে। আসুন আমরাও আমাদের নিজেদের চরিত্রের রূপ আপন আয়নায় দেখি এবং বিশ্লেষণ করি।
 
বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানালেন, পাবনা পৌরসভার কাছে বিদ্যুৎ বিভাগের প্রাপ্য প্রায় সাড়ে সাত কোটি টাকা। সারা দেশে এভাবেই বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিদ্যুৎ বিল বকেয়া পড়ে আছে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। যে টাকা বকেয়া পড়ে আছে তা দিয়ে একটি ২’শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপন করা সম্ভব। কোন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ বিল পর পর দুই মাস বন্ধ থাকলেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। অথচ সরকারি প্রতিষ্ঠান সমূহ মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করছে না এর পরেও সেই প্রতিষ্ঠানের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয় না! একই দেশে দুই নিয়ম? এখানে পাবনা পৌরসভার উদাহরণই যদি দেই তা হলে দেখা যাবে, জনগণ বা নাগরিকরা ট্যাক্স পরিশোধ করেন ঠিকই, কিন্তু পৌর কর্তৃপক্ষ সরকারি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেও তার বিল পরিশোধ করেননি।  কারণ অনুসন্ধান করতে হবে। এর জন্য দায়ী কে? তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
 
এখানে প্রসঙ্গক্রমে একটি কথা না বললেই নয়। পাবনা পৌরসভা কর্তৃপক্ষ আবর্জনা পরিষ্কারের জন্য ব্যবহৃত ট্রাক এবং ট্রাক্টর সমূহের লাইসেন্স না করেই বছরের পর বছর তা ব্যবহার করছেন। এসব যানবাহনের নম্বর প্লেটে লেখা আছে ‘পাবনা পৌরসভা’। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী বা প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব যানবাহন চলাচল করলেও কোন আইনানুগ ব্যবস্থা তারা নেন না। ট্রাক এবং ট্রাক্টরের লাইসেন্স না করে এক্ষেত্রে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ একটি বেআইনী কাজ করছেন পাশাপাশি সরকারি কর ফাঁকি দিচ্ছেন। যেখানে পৌরসভা কর্তৃপক্ষই দেশের প্রচলিত আইন অমান্য করছেন সেখানে নাগরিকদের কাছে তারা কেমন আচরণ আশা করতে পারে? আর নাগরিকরা কেমন সেবা পাবে? নিজে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে হবে এবং সেই সাথে অপরকে আইন মানতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
 
 সংবাদপত্রের খবরেই পড়েছি সংসদ সদস্যদের টেলিফোন বকেয়া বিল প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা। সারা দেশে এই বকেয়ার পরিমাণ প্রায় আট’শ কোটি টাকা। বকেয়া টেলিফোন বিলের বেশিরভাগই সরকারি প্রতিষ্ঠানের। একসময় টেলিফোনের সংযোগ নিতে ঘুষ দিতে হতো, এমপি-মন্ত্রীদের সুপারিশ লাগতো। এখন সেই টেলিফোনের বিল বকেয়া পড়ে থাকে বছরের পর বছর! টেলিফোন বিভাগের কোটি কোটি টাকার জমি বা সম্পদ সারাদেশব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এই বিভাগটি এখন অনেকটাই অপ্রয়োজনীয়। এখন এই দপ্তরের লোকবল কমেছে। বেসরকারি টেলিফোন কোম্পানি সমূহ লাভজনক হলেও সরকারি টেলিটক সংস্থাটি এখন লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এর ভাল কিছু কি আমরা দেখতে পারবো? অন্যান্য বেসরকারি টেলিফোন কোম্পানি যেখানে লাভ করে গ্রাহক সেবার মান বৃদ্ধিতে কাজ করছে সেখানে টেলিটক-এর অবস্থা খুবই নাজুক। অথচ তাদের টাকা বকেয়া পড়ে আছে গ্রহকের কাছে!
 
টেলিফোন প্রসঙ্গে কথা বলতে গেলে মনে পড়ে গত দশকের গোড়ার দিকের কথা। ১৯৯৫-’৯৬ অর্থবছরে আমার এক বন্ধু টেলিফোন সংযোগ নেয়ার জন্য আবেদন করলেন। টেলিফোন অফিসের এক বড় কর্তা তাকে পরামর্শ দিলেন, শুধু আবেদন করলেই চলবে না। আবেদনপত্রের উপর একজন মন্ত্রীর সই করে দিতে। তিনি সেটি করেছিলেন। এর পরেও তাকে আরও কিছু বাড়তি টাকা উৎকোচ দিতে হয়েছিল টেলিফোন সংযোগ নিতে। আবার আমার এক পরিচিতজন টেলিফোনের বকেয়া বিল পরিশোধ না করায় মামলার আসামী হয়ে আদালতে হাজিরা দেন। পরে আদালতের অনুমতি নিয়ে কিস্তিতে বকেয়া পরিশোধ করে মামলা থেকে অব্যাহতি পান। এখন টেলিফোন হাতে হাতে। প্রতিদিন গ্রাহকরা বহু টাকা ব্যয় করছেন টেলিফোনের বিল বাবদ। উন্নত দেশ সমূহে এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এবং ভূটানে ল্যান্ডটেলিফোন ব্যবহার হয় প্রিপেইড বিল সিস্টেমে। সেখানে মোবাইল ফোনের মতই ল্যান্ডফোনের জন্য অগ্রিম টাকা লোড করতে হয়। এতে বকেয়া বিলের পদ্ধতিটা থাকে না। এখন দেখি সরকারি অফিসের টেলিফোন যথেচ্ছ ব্যবহার হয়। কর্তা-কর্মচারির হাতে মোবাইল ফোন আছে এর পরেও দেশে-বিদেশে আত্মীয়-স্বজনদের সাথে কথা বলছেন অফিসের সরকারি টেলিফোনে। সরকারি টেলিফোনটি যে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য নয়, তা জেনেও না জানার ভান করে অনিয়মটি করছেন তারা। যেখানে সরকারি সম্পত্তি বা সম্পদ রক্ষা করা  বা দেখভালের দায়িত্বটি সরকারি কর্তার সেখানে তিনিই জনগণের টাকা বা সরকারি  টাকা খরচ করে ব্যক্তিগত কাজটি করছেন! এসব অপকর্ম যেন গা সওয়া হয়ে গেছে। কারণ তিনি  মনে করছেন এ আর এমনকি অন্যায় করছি। এর চেয়ে বড় বড় অন্যায় কর্ম অন্যরা করছেন তাতে তো কিছু হচ্ছে না। এভাবেই আমরা সকলে কম-বেশি অন্যায়-অনিয়ম করে চলেছি। রাষ্ট্রের বা জনগণের অর্থের অপব্যবহার করছি। এতে ক্রমশই আইন অমান্য করার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এভাবে চললে তো সকলের জন্যই অমঙ্গল বয়ে আনবে। দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্থ হবে।
 
ভূমিকর বকেয়ার পরিমাণ প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। এই বকেয়ার সিংহভাগই সরকারি প্রতিষ্ঠানের। আমার জানা মতে বাংলাদেশের মানুষ জমির খাজনা বকেয়া রাখে না। কারণ তারা জানেন জমি রাখতে হলে খাজনা অবশ্যই  দিতে হবে। বংশ পরম্পরায় তারা এই ভূমিকর পরিশোধ করে আসছেন। এরও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আছে। মোঘল কিংবা ব্রিটিশ এবং পাকিস্তান আমলে ভূমিকর বকেয়া থাকায় বহু ব্যক্তির জমি নিলাম হওয়ার খবর এদেশের জনগণ জানে। তারা প্রতিনিয়ত নাটক-সিনেমা এবং গল্প-ঔপন্যাসে এসব দেখে এবং পড়ে জেনেছেন। তাই তারা ভূমিকর পরিশোধ করেন প্রতিবছরই। এছাড়াও সরকারি বিভিন্ন রাজস্ব পরিশোধের ব্যাপারে ছোট-ব্যবসায়ীরা বেশি তৎপর। দেড় হাজার কোটি টাকা ভূমিকর বকেয়া না থাকলে বড় একটি প্রকল্পের কাজ করা যেতো। বর্তমানে দেশীয় অর্থে যে পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ হচ্ছে সেকাজেও টাকাগুলো কাজে  লাগানো যেতো অথবা বুড়িগঙ্গা, করতোয়া কিংবা মধুমতি এমন মাঝরি নদীর উপর একটি ব্রিজ নির্মাণ করা সম্ভব।
সরকারি তহবিল জনগণের কর দ্বারাই গঠিত হয়। যে দেশের জনগণ যত বেশি কর প্রদান করে সেই দেশ তত উন্নত। এদেশের জনগণও এখন আগের চেয়ে কর প্রদানে অভ্যস্ত। এর পরেও কর বকেয়া থাকছে। কর বা আয়কর আদায়ে আরও আন্তরিক হতে হবে সরকারি কর্মকর্তাদের। এর জন্য যে সব কার্যকরি পদক্ষেপ দরকার তা নিতে হবে। যদিও এখন প্রতিটি জেলা-উপজেলায় আয়কর মেলা হচ্ছে। এতে জনগণ সচেতন হচ্ছে। তারা আয়কর দিতে এগিয়ে আসছে। একটি পরিসংখ্যানে জানা গেছে বিত্তবানদের মধ্যেই কর ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা বেশি।
 
সর্বশেষে আলোচনা করতে চাই সোনা উদ্ধারের বিষয়টি নিয়ে। গত বছর বিমান বন্দরসহ বিভিন্ন স্থানে সরকারি আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ও কাস্টমস্-কর্মকর্তাদের  হতে আটক হয়েছে প্রায় ৩ হাজার কেজি সোনা। যার বাজার দর প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। এই সোনা সরকারি তহবিলে জমা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার বিশ্ব অর্থনীতি বা মূদ্রাস্ফিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিদেশী ব্যাংকে সোনা ক্রয় করে রেখেছে। যে দেশের স্বর্ণের মজুদ যত বেশি সে দেশের অর্থনীতি তত বেশি মজবুত বা দৃঢ়। সোনার বাজার দর ওঠা-নামা করছে গত কয়েক বছর ধরে। সম্পদশালী এবং ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো সোনার বাজার দর নিয়ন্ত্রণ করে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রাধান্য ধরে রাখার প্রয়াশ পাচ্ছে। এমন অস্থির পরিস্থিতিতে আমাদের আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং কাস্টমস্ কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব পালন করে সোনা চোরা চালানকারীদের কাছ থেকে সোনা আটক করে যথাযথ দায়িত্ব পালন করেছেন।
 
মাত্র পাঁচ হাজার বছর আগে রাজ্য এবং চার হাজার বছর আগে সাম্রাজ্য শাসন ব্যবস্থার সূচনা হয়। তার আগেও দেশ ছিল বটে তাতে শৃংখলা বা আইন-কানুনের বালাই ছিল না। যাযাবর জীবন ব্যবস্থার পরিবর্তে মানুষ সভ্য হয়েছে। সুশৃংখল শাসনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা এক দিনে হয়নি। তা হয়েছে ক্রমান্বয়ে। জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-সংস্কৃতি, আইন-কানুন, শাসন-প্রশাসন, কৃষি-শিল্প, স্থাপত্য-ভাস্কর্য, শিল্পকলাসহ মানব উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে। রাষ্ট্র বা দেশ জনকল্যানের জন্যই প্রতিষ্ঠিত হয়। জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা, শিক্ষা, খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, বাসস্থান ইত্যাদি দেয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আর এসব সুনিশ্চিত করতে হলে আইন মান্য করা আবশ্যক। কর ফাঁকি দেয়া মানে নিজেকে ফাঁকি দেয়া। তাতে দেশ ও জনগণের ক্ষতি হয়।
 
বিবার্তা/স্বপন/সাইমুম                                                          
 
 
 
 
 
 
  
সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (২য় তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১১৯২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2020 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com