নারী জন্ম নেয় না, ‘নারী’ হয়ে ওঠে

নারী জন্ম নেয় না, ‘নারী’ হয়ে ওঠে
প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০১৬, ১৩:০৯:৪৭
নারী জন্ম নেয় না, ‘নারী’ হয়ে ওঠে
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
প্রিন্ট অ-অ+
এবারের বিশ্ব নারীদিবসের প্রতিপাদ্য (থিম) হচ্ছে ‘সমতার আহবান’। এ থিম বেছে নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ‘লৈঙ্গিক সমতা অর্জনের ক্ষেত্রে এ গ্রহবাসী অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু বিশ্বে লৈঙ্গিক বৈষম্য ঠিকই রয়ে গেছে।’ বলা হচ্ছে, সমঅধিকারের জন্য নারীকে মাত্রাতিরিক্ত পুরুষ-নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতেই হবে। পাশাপাশি নারী-পুরুষ কিভাবে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে পারে, তার একটি টেকসই মঞ্চ তৈরি করতে হবে।
 
ভারতীয় লেখিকা অরুন্ধুতী রায় নারীর জেগে ওঠার মন্ত্র দিয়েছেন এভাবে, ‘ড্রিম অ্যান্ড ডিমান্ড দি ইমপসিবল’। কারণ তিনি এটা ভালো করেই বুঝতে পেরেছেন, নারীর সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো, নারী সাধারণত নারীর পক্ষে দাঁড়ায় না। চোখে আঙুল দিয়ে এ সীমাবদ্ধতা দেখিয়ে দেয়ার পরও তারা কেন জানি, এটাকে সীমাবদ্ধতা হিসেবে মানতে নারাজ।
 
তাঁর মতে, চোখের সামনে সামান্য একটি তর্জনী আঙুল উঁচিয়ে ধরে যেমন করে হিমালয়ের মতো মহাসত্যকেও অস্বীকার করে ফেলা যায়, একই কায়দায় নারী তার সত্তাকে নারীর দৃষ্টি দিয়ে না দেখে পুরুষের দৃষ্টি দিয়ে ভাবতে গিয়ে ‘সম-অধিকার’ এর চেতনাটুকুও হারিয়ে ফেলে। সামন্তবাদী পুরুষরা নারীকে প্রতারিত সান্ত¡নায় ডুবিয়ে মারার জন্য বলে “যে কোনো মাস্টারপিস তৈরির আগে শিল্পী একটা খসড়া স্কেচ তৈরি করেন। এ দৃষ্টিকোণ থেকে পুরুষ ‘রাফ স্কেচ’ আর নারী ‘মাস্টারপিস’।” এটারও যে পাল্টা যুক্তি থাকতে পারে, সেটা নারী ভেবেই দেখে না।
 
হয়তো নারীকে ভোলানোর জন্য বলা হয়ে থাকে ‘একজন নারী স্রেফ একটি ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলে যা বুঝিয়ে দিতে পারে, একজন পুরুষ তা এক প্রস্থ লেকচার দিয়েও বোঝাতে পারে না। কিন্তু এ প্রান্তিকধর্মী চিন্তাও নারীকে ‘মানুষ’ না ভাবার ফসল।
 
সন্দেহ নেই, অঙ্গসৌষ্ঠবের দিক থেকে প্রকৃতি নারীর প্রতি পক্ষপাতিত্ব করে। কারণ পুরুষের আগে প্রকৃতি নারীকে সৌন্দর্য (যৌবন) দেয়। তবে ছিনিয়ে নেয় পুরুষের আগে। অ্যাব্রোজ বিয়ার্স তাঁর ‘দি ডেভিলস ডিকশনারী’ গ্রন্থে নারীর সংজ্ঞায় বলেছেন, ‘যে একজনের সঙ্গে কথা বলে, তাকায় দ্বিতীয় জনের দিকে, মনে রাখে তৃতীয়জনকে।’ অবশ্য যারা প্রান্তিকধর্মী চিন্তায় অভ্যস্থ তারা বলেন, নারীকুলে কোনো মোজার্ট নেই যেমন করে নেই জ্যাক দ্য রিপার। আসলে নারী ও পুরুষের মৌলিক ব্যবধান হচ্ছে একজন নারী চায় একজন পুরুষ তার সব চাহিদা পূরণ করে দিক। অন্যদিকে একজন পুরুষ চায় সব নারী তার চাহিদা পূরণ করে দিক। গণ্ডগোল শুধু পাবার মধ্যেই নয়, চাওয়ার মধ্যেও রয়ে গেছে।
 
নিজের ফটো দেখে নারী খুব কমই সন্তুষ্ট হতে পারে। কারণ নারী মাত্রই নিজেকে ‘তবু তো চুল বাঁধিনি’ গোছের সুন্দরী ভাবে। নারী তাই সব ভাষাতেই কমবেশি বিস্ময়। সিমোন দ্য বোভেয়ার তার ‘দি সেকেন্ড সেক্স’- এ দাবি করেছেন , নারী জন্মায় না, নারী ‘নারী’ হয়ে ওঠে।
 
নারীবাদীদের অভিযোগ, বিশ্বের অধিকাংশ শিশুতোষ ছড়া খোকা বা খোকনকে নিয়ে। খুকুকে নিয়ে ছড়া নেই বললেই চলে। একইভাবে অধিকাংশ কার্টুন ছবির হিরোরা খোকা। মিকি মাউস, টম অ্যান্ড জেরি, স্কুবি-ডুবি, কিংবা দ্য হোয়াইট লায়ন থেকে শুরু করে অধুনা জেটিক্স বা কার্টুন নেটওয়ার্কে প্রচারিত সব প্রধান কার্টুন চরিত্রের সবাই খোকা, খুকি নয়। কমিকস চরিত্রগুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা। টিনটিন, ব্যাটম্যান, স্পাইডার ম্যান- সবই তো খোকা!
 
বাংলা কাব্যসাহিত্যের বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে রাশি রাশি রমণীমোহন কবিতা। রবীন্দ্রনাথও স্তাবকতার আতিশয্যে রক্ত মাংসের রমণীকে স্বর্গের অপ্সরা বানিয়ে ছেড়েছেন। নজরুল তো তার প্রেয়সীকে সাজাবার জন্যে জোছনার চন্দন থেকে শুরু করে তারার ফুল পর্যন্ত, পুরো মহাবিশ্ব থেকে উপকরণ সংগ্রহ করতেন। এভাবে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের সব কালের সাহিত্যকর্মে কমবেশি নারীস্তুতি হয়েছে।
 
পূর্ণাঙ্গ একজন নারীকে প্রত্যঙ্গ-বিশেষ ভাবার মানসিকতা অনেক পুরনো। এরিস্টটল জোর গলায় দাবি করতেন ‘কতিপয় গুণের ঘাটতির কারণে নারী হয়েছে ‘নারী’।  আর প্লেটো ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তাকে নারী হিসেবে সৃষ্টি না করার জন্য।
 
বাস্তবতা হচ্ছে মানবজাতি বলতে মূলত পুরুষকে বোঝানো হয় এবং পুরুষ নারীকে নারীর নিজের মতো করে ব্যাখ্যা না করে পুরুষনির্ভর হিসেবে ব্যাখ্যা করতে সব সময় তৎপর থাকে। অন্যদিকে নারীদের প্রচেষ্টা একটি প্রতীকী আন্দোলনের বেশি কিছু হয়ে ওঠেনি। বিষয়টাকে এভাবেও বলা যায় ‘তারা কেবল ততটুকুই পেয়েছে, যতটুকু পুরুষরা তাদের দিতে চেয়েছে। তারা কিছুই অর্জন করেনি। কেবল গ্রহণ করেছে। ছত্রভঙ্গ হয়ে থেকেছে পুরুষের ভিতরে’।
 
বলা হয়, ‘যে নারী পুরুষকে বিশ্বাস করে, সে বোকা; যে অবিশ্বাস করে, সে নির্বোধ; যে নির্ভর করে, সে অকর্মণ্য। এর বাইরে নারীর জন্য কোনো অপশন রাখেনি পুরুষ।’
 
পুরুষের কৌশলগত বিশ্লেষণেও নারী অসম্পূর্ণ। পুরুষ তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বেছে নিয়েছে নারীকে। কিন্তু নারীর প্রতিদ্বন্দ্বী সে নিজেই; তাই সে খণ্ডিতই থেকে যায়। তা-ই দুর্জনেরা বলেন, নারী পছন্দ করে না স্ত্রৈণ পুরুষ। কেবল নিজের স্বামীকে ছাড়া।
 
নারীবাদীরা ইচ্ছে করলেই মহাকাশেও বৈষম্য খুঁজে নিতে পারে। কারণ সূর্যকেন্দ্রিক আমাদের এই সৌরজগতের এগারটি গ্রহের মাঝে ভেনাস ছাড়া অন্য কোনো গ্রহ নারীর নামে হয়নি।
 
তবে সমস্ত যোগ-বিয়োগের বাইরে এটাই সত্য, ‘খণ্ডিত সত্য মোটেও সত্য নয়।’ নারীকে ছোট করতে গেলে শুধু পুরুষেরই অবমাননা হয় না, মানবতারও অবমাননা হয়। নারী ছাড়া পুরুষ কবে পরিপূর্ণতা পেয়েছে? পুরুষ নারীকে প্রতিপক্ষ ভাবলে অথবা নারীও যদি পুরুষকে প্রতিপক্ষ ভাবে, তাহলে ‘মানুষ’ আর থাকে কই?
 
বিবার্তা/জিয়া
সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (২য় তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১১৯২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2020 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com