এ বৈষম্যের শেষ কোথায়?

এ বৈষম্যের শেষ কোথায়?
প্রকাশ : ২৫ মার্চ ২০১৬, ০৭:৫৮:০৮
এ বৈষম্যের শেষ কোথায়?
কাজী ফিরোজ রশীদ
প্রিন্ট অ-অ+
একাত্তরের মার্চ মাস। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ শেষ বর্ষের ছাত্র। ইকবাল হলের (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ২১৮ নং রুমে থাকি। বাসা সদরঘাটের ১ নং সিম্পসন রোডে। 
 
জগন্নাথ কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলাম তিন বছর। তাই পুরান ঢাকার এই অঞ্চলে আমার প্রভাব প্রতিপত্তি এবং নেতৃত্ব ছিল অনেক শক্ত। ১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধু এই পুরান ঢাকা থেকে মুসলীমগের প্রার্থী নবাব খাজা খয়েরউদ্দিনকে বিপুল ভোটে হারিয়ে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হন। 
 
ওই নির্বাচনে জগন্নাথ কলেজ এবং কায়েদে আজম কলেজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার ছাত্র বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে নির্বাচনী প্রচারে দিনরাত কাজ করেছি। 
 
আমরা বাঙালিরা ছিলাম শোষণ, বঞ্চনা আর অবহেলার শিকার। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক মনে করতো। তাই বঙ্গবন্ধু যখন বাঙালির মুক্তি সনদ ৬ দফা দিলেন।
 
তখন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ৬ দফার বাণী বাংলার মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিল। আমরা নতুন পথের সন্ধান পেলাম। আমাদের মাঝে স্বাধীনতার স্বপ্ন জেগে উঠলো।
 
তাই যখন ইয়াহিয়া ১ মার্চ পার্লামেন্ট অধিবেশন বন্ধ ঘোষণা করলো-তখনই ছাত্র-জনতাসহ গোটা বাঙালি জাতি রাজপথে নেমে আসলো। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সব অফিস-আদালত কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেল। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পাড়ামহল্লা ও গ্রামগঞ্জে সর্বত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হলো। পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা সর্বত্র উত্তোলন করা হলো। 
 
আমার এবং সাইফুদ্দিনের নেতৃত্বে হাইকোর্ট থেকে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়ানো হলো। শুরু হলো সর্বাত্মক মুক্তি সংগ্রামের প্রস্তুতি। স্লোগানে স্লোগানে কেঁপে উঠলো ঢাকা নগরীসহ সারাদেশ। “বীর বাঙালি অস্ত্র ধর-বাংলাদেশ স্বাধীন করো”,“ লড়াই লড়াই লড়াই চাই-লড়াই করে বাচঁতে চাই”, “পদ্মা মেঘনা যমুনা-তোমার আমার ঠিকানা”, “ঢাকা না পিন্ডি-ঢাকা ঢাকা” ইত্যাদি।
 
৫ মার্চের রাতে জগন্নাথ কলেজে এক গোপন সভা করলাম। যতটুকু মনে পড়ে সেই সভায় আমিসহ সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, নূরে আলম সিদ্দিকী, আসম রব, আব্দুল কুদ্দস মাখন, কাজী আরেফ, এম এ রেজা, শেলী ভাই, সাইফুদ্দিন রেজা শাহজাহান, মফিজ, এলাহি বক্স, তারণ, ইব্রাহিম, কালু, আলিম হাজী, সর্দার নাসির উপস্থিত ছিল। 
 
সবার মধ্যে ছিল দারুণ উৎকণ্ঠা এবং টান টান উত্তেজনা। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম-বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পরই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। 
যথারীতি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট করে বললেন-“ তোমাদের যার যা কিছু আছে তা নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে”। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম-এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয়বাংলা। 
 
আমরা স্পষ্ট নির্দেশনা পেলাম। একদিন পর রাতে ইকবাল হলে আবার স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভা ডাকা হলো। সেই সভায় ৪ খলিফা নামে খ্যাত নূরে আলম সিদ্দিকী, আসম রব, শাহজাহান সিরাজ, আব্দুল কুদ্দস মাখন ছাড়াও মোস্তফা মহসিন মন্টু, খসরু, ফিরুসহ জগন্নাথ এবং কায়েদে আজম কলেজের ছাত্রনেতারা যোগ দিলেন।
 
সিদ্ধান্ত হলো অস্ত্র সংগ্রহ করা এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়ার। ইকবাল হল মাঠে মন্টু ভাই, খসরু ও ফিরু ভাইয়ের নেতৃত্বে ট্রেনিং ক্যাম্প খোলা হলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-ছাত্রী ব্রিগেড সবাই ট্রেনিং ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নেয়া শুরু করলো। আমরাও অস্ত্র সংগ্রহে নেমে পড়লাম।
 
বিভিন্ন রাইফেল ক্লাব এবং অন্যান্য স্থান থেকে হালকা অস্ত্র সংগ্রহ চলছিল। ২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধু নূরে আলম সিদ্দিকীকে নির্দেশ দিলেন- মহম্মদপুর গিয়ে বিহারী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করতে। যাতে তারা আমাদের সংগ্রামে শরিক হয় এবং মিরপুর মহম্মদপুরের সব বিহারি বাড়িতে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়ানো হলো।
 
বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে নূরে আলম সিদ্দিকী, আমি, মোহাম্মদ হোসেন সেরনিয়াবত, এ এউ আহম্মদ, মহসিনসহ অনেকে মহম্মদপুরে একটি বাঙালি বাড়িতে বিহারিদের নিয়ে সন্ধ্যার পর বৈঠকে বসি। বিহারি নেতারা বার বার বলেছিল-আমরা আপনাদের খাবার তৈরি করছি, অবশ্যই রাতে আমাদের এখানে খাবেন।
 
আমার কাছে একটি পিস্তল ছিল। রাত ৯টার দিকে আমি সভা থেকে উঠে সিগারেট খেতে নিচে রাস্তার ধারে দোকানে গেলাম। সিগারেট কিনতে গিয়ে বুঝলাম যে আমরা বিহারীদের ষড়যন্ত্রের জালে আটকা পড়ে গেছি। যে কোনো সময় ওরা আমাদের আক্রমণ করে বসবে। আমি সঙ্গে সঙ্গে উপরে এসে নূরে আলম সিদ্দিকী ভাইকে কানে কানে সব বললাম। তিনি বিলম্ব না করে আমাদের নিয়ে রাস্তায় নেমে আসলেন। বিহারি নেতাদের বুঝালেন-আমরা এক্ষুনি আবার খেতে আসবো। 
 
বাইরে গাড়িতে উঠে ঢাকা কলেজের সামনে চিটাগাং হোটেলে সবাই ভাত খেলাম। ইতোমধ্যে গোটা শহরের মানুষ রাস্তায় নেমে ব্যারিকেড দেয়া শুরু করেছে। আমরা সোজা বঙ্গবন্ধুর ৩২নং বাড়িতে গাড়ি নিয়ে গেলাম। বঙ্গবন্ধু ছিলেন খুবই উদ্বিগ্ন এবং অস্থির। 
 
নূরে আলম ভাই বঙ্গবন্ধুকে আমাদের সঙ্গে আসার জন্য অনুরোধ জানালেন। আমি ছিলাম সশস্ত্র অবস্থায়। বঙ্গবন্ধু আমার কাঁধে হাত রেখে বললো, তোমরা এখনই নিরাপদ স্থানে চলে যাও। যুদ্ধের প্রস্তুতি নাও। আমি সবাইকে ম্যাসেজ পাঠিয়ে দিয়েছি।
 
আলম ভাই, মাখন ভাই, মাছুদ, মহসিন সবাই আনোয়ার হোসাইন মঞ্জু ভাইয়ের ধানমন্ডির বাসায় চলে গেল। কিন্তু আমি অস্ত্র নেয়ার জন্য ইকবাল হলে চলে আসলাম। ইকবাল হল থেকে অস্ত্র নিয়ে আমি, মহসিন, রঙ্গু সদরঘাট চলে আসি। 
 
রাত ১১.৩০ মিনিটে ঢাকা শহরে নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর পাক আর্মির অ্যাকশন শুরু হলো। রাজারবাগ, পিলখানা, ইকবাল হল, জগন্নাথ হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সর্বত্র অসংখ্য মানুষকে হত্যা করলো। পিলখানা থেকে পুলিশ এবং ইপিআর সদস্যরা সদরঘাটে আমাদের সাথে যোগদিল। 
 
আমরা বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে কেরানীগঞ্জ চলে গেলাম। ওখান থেকে শুরু হরো মুক্তিযুদ্ধ। জীবনের বিনিময়ে রক্ত দিয়ে কেনা এই স্বাধীনতা। আমাদের জীবন ধন্য যে আমরা যৌবনে স্বাধীনতা যুদ্ধে যাবার সুযোগ পেয়েছি। এই সুযোগ আর কারো জীবনে কখনও আসবে না।
 
কিন্তু যখন প্রশ্ন করি, যে স্বপ্ন বুকে ধারণ করে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি-আমাদের সেই স্বপ্ন কি পূরণ হয়েছে! এক কথায় বলবো- স্বপ্নতো কখনো পূরণ হয় না। পাকিস্তানের শোষণ, অত্যাচার, নির্যাতন আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়ে দেশ স্বাধীন করেছি। 
 
পাকিস্তানের ২৩টি ধনী পরিবারকে হটিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে আজ পাঁচ হাজার ধনী পরিবার সৃষ্টি হয়েছে। যাদের হাতে রয়েছে দেশের নব্বই ভাগ সম্পদ। আর বাকি দশ শতাংশ সম্পদের মালিক দেশের ১৬ কোটি মানুষ। এ বৈষম্যের শেষ কোথায়?
 
লেখক: রাজনীতি ও পার্লামেন্টারিয়ান
 
সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (২য় তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১১৯২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2020 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com