নানা ধর্মে রোজা

নানা ধর্মে রোজা
প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০১৬, ১৩:১৩:২৮
নানা ধর্মে রোজা
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+
বিভিন্ন ধর্মে উপবাস প্রথা প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে চলে আসছে। আধুনিকতম ধর্ম ইসলামের রোজা ওইসব উপবাস প্রথারই ধারাবাহিকতা। তবে এর ধরনটা একটু আলাদা। অন্যান্য ধর্মে নির্দিষ্ট কয়েক দিন উপবাস থাকার বিধান রয়েছে। যেখানে ইসলামে টানা একমাস নিয়ম করে রোজা থাকতে হয়। আর এই উপবাসের (রোজা) ধরনটাও আলাদা। 
 
ইসলামি পরিভাষায়, আল্লাহর উদ্দেশে সুবহে সাদিকের আগে থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার এবং সব ধরনের ইন্দ্রিয় তৃপ্তি থেকে বিরত থাকাই রোজা। 
 
রোজার শুরু সেমিটিক ধর্মগুলোর প্রথম নবী এবং প্রথম মানুষ হযরত আদম (আ.) থেকে। তার অনুসারীদের ওপর প্রতি মাসে তিন দিন রোজা ফরজ ছিল। হযরত আদমের উম্মতরা চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ রোজা পালন করতেন। রোজার এই ফরজ বিধান ধারাবাহিকভাবে হযরত নুহ (আ.) পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।
 
অপর দুই সেমিটিক ধর্ম ইহুদি ও খ্রিস্ট ধর্মেও রোজার প্রচলন ছিল এবং এখনো কিছুটা আছে। বিশেষভাবে ইহুদিদের জন্য সপ্তাহের শনিবার, মহররমের ১০ তারিখ রোজার বিধান কার্যকর ছিল। অবশ্য হজরত মুসার (আ.) ওপর তাওরাত নাজিলের আগে তুর পাহাড়ে আসা-যাওয়ার চল্লিশ দিনও ইহুদিরা রোজা পালন করতেন। 
 
ইঞ্জিল (বাইবেল) নাজিল হওয়ার আগে হযরত ঈসার (আ.) দীর্ঘ চল্লিশ দিন রোজা ও সাধনায় মগ্ন ছিলেন। হযরত দাউদ (আ.) একদিন পর পর রোজা পালন করতেন। (বুখারি, মুসলিম) 
 
হিন্দু প্রাচীন ধর্মগুলোর মধ্যে অন্যতম হিন্দুধর্ম বা বৈদিক ধর্ম। বর্তমান হিন্দু ধর্মে প্রতিটি পূজায় ব্রতী পূজারি ও অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা নারীপুরুষ উপবাস করে থাকেন। এছাড়াও অমাবস্যা ও পূর্ণিমা ইত্যাদি তিথিতে উপবাস করেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। হিন্দুরা একাদশী (চাঁদের ১১ তারিখ) উপবাস পালন করে থাকেন। 
 
অনেকে বিশেষ দেবতার পূজা উপলক্ষে প্রতি শনিবার, শুক্রবার, বৃহস্পতিবার অথবা মঙ্গলবার উপবাস করেন। তবে এর মধ্যে কেউ ‘নিরম্বু’ উপবাস করলে পানিও পান করা যায় না। তবে ক্ষেত্রবিশেষে করা যায়। 
 
আল্লামা সুলাইমান নদভীর সিরাতগ্রন্থ সূত্রে প্রাচীন মিশরীয়দের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় রোজার সন্ধান মেলে। তাছাড়া পারসিক (অগ্নিপূজক) ধর্মাবলম্বীরাও গুরুত্বসহ রোজা পালন করেন। হিজরি দ্বিতীয় বছর উম্মতে মুহাম্মদির ওপর রোজা ফরজ করা হয়।
 
আল্লামা ইমাদুদ্দিন ইবনে কাসিরের মতে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে তিন দিন রোজা রাখার বিধান ছিল। পরে রমজান মাসের রোজা ফরজ করা হয়। অন্যান্য ধর্মে রোজার বিধান থাকলেও ইসলামের রোজা আর অন্য ধর্মের রোজায় যেমন পার্থক্য আছে তেমন মিলও আছে। 
 
ইহুদি ধর্মে রোজা শোক ও বেদনার প্রতীক। রোজা মোসলমানদের জন্য শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয় আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের পন্থাও। হিন্দু ধর্মের উপবাসও একই উদ্দেশ্যে করা হয়। এমনকি ইসলামের রোজার মতো কাজা উপবাসের ব্যবস্থাও আছে। 
 
ইসলামে রোজার ঐতিহাসিক গুরুত্বও আছে। যেমন: প্রথম রোজায় হযরত ইব্রাহিম (আ.) সহিফা এবং ৬ রোজায় হযরত মুসা (আ.) তাওরাত লাভ করেন। ১৩ রোজায় ঈসার (আ.) ওপর ইঞ্জিল, ১৮ রোজায় হযরত দাউদ (আ.) জাবুর এবং ২৭ তারিখে মোসলমানদের ধর্মগ্রন্থ কোরআন অবতীর্ণ হয়। ইসলামের প্রথম যুদ্ধ বদরের যুদ্ধের সূচনা ১৭ রোজায়। নবীদৌহিত্র হযরত হাসানের জন্ম হয় ১৫ রোজায়।
 
জান্নাতি নারীদের নেত্রী ফাতোমার (রা.) মৃত্যু ৩ রোজা। হযরত খাদিজা ও হযরত আয়েশার (রা.) শেষ বিদায় যথাক্রমে ১০ ও ১৭ রোজায়। ২১ রোজায় শেষ বিদায় নেন ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা.)। 
 
বৌদ্ধ বৌদ্ধ ধর্মে উপবাস করা হয় মূলত রসনা নিয়ন্ত্রণ ও ভোগ থেকে নিজেকে বিরত রাখার কৌশল হিসেবে। বৌদ্ধ আত্মনিয়ন্ত্রণের কৌশলকে বলে ‘ধুতাঙ্গা’। অন্তত তিরিশটি পদ্ধতি আছে এ ধরনের নিয়ন্ত্রণের। এর মধ্যে চারটি খাদ্যগ্রহনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যেমন: দিনে একবার ভক্ষণ (একাহারি), এক বসাতে খাওয়া, কম খাওয়া (স্বল্পাহারি), মেঙ্গে খাওয়া, প্রথম সাত বাড়ি থেকে যা পাওয়া যায় তা-ই খাওয়া। এর যেকোনো একটি কেউ বেছে নিতে পারে। 
 
জৈন জৈন ধর্মে উপবাস কয়েক প্রকার। পূর্ণ উপবাস: একটা নির্দিষ্ট সময় খাদ্য পানীয় স্পর্শ না করা আংশিক উপবাস: ক্ষুধা নিবারণের জন্য যতোটুকু প্রয়োজন তার চেয়েও কম খাওয়া ব্রতী সংক্ষেপা: নিয়মিত খাবারের আইটেম কমানো রাসা পরিত্যাগা: প্রিয় খাবারগুলো স্পর্শ না করা জৈন ধর্মে আরো দুই ধরনের উপবাস আছে। টানা কয়েক মাস উপবাস করা। যেমন: জৈন ধর্মের প্রবক্ত মহাবীর টানা ছয় মাসেরও বেশি উপবাস করেছিলেন। 
 
বর্তমানকালের অনেক জৈন ধর্মাবলম্বীও এই অসম্ভব কর্মটি করেন যেমন: হীরা রতন মানিক। তিনিও ছয় মাসের অধিক উপবাস করেছেন। শ্রী সহজ মুনি মহারাজ টানা এক বছর উপবাস করে রেকর্ড করেছেন। ১৯৯৮ সালের ১ মে তার ৩৬৫ দিন পূর্ণ। এ ধর্মে আরেক ধরনের উপবাস আছে। যাকে বলা যায় ‘আমৃত্যু উপবাস’। জৈন ধর্মগুরুরা মহাপরিত্রাণের জন্য আমৃত্যু উপবাস করে থাকেন। একে বলে সান্থারা বা সালেংখানা। 
 
এছাড়া চীনের তাও এবং কনফুসিয়াস মতানুসারীরাও একজন উপবাস করে থাকেন। তবে একটু অন্যভাবে। উত্তেজক মসলা, যৌন সংসর্গ এবং বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবার না খাওয়া এ মতের অনুসারীরা উপবাস হিসেবে বিবেচনা করেন।
 
বিবার্তা/জিয়া
 
সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (২য় তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১১৯২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2020 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com