বিভিন্ন ধর্মে পশু কুরবানী

বিভিন্ন ধর্মে পশু কুরবানী
প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০১৬, ১৪:০২:০৪
বিভিন্ন ধর্মে পশু কুরবানী
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+
পশু বলী, পশু জবাই, পশুর মাংস খাওয়া মানব পৃথিবীতে মানুষ আসার পরের ইতিহাসই হয়ে থাকবে। প্রাচীন গুহাবাসী মানুষের জীবনে এর গুরুত্ব এবং ফল দুটোই দেখা যায়। বনবাসী মানুষদের আয়োজন করে পশুহত্যার দেয়ালচিত্র আজো সে প্রমাণ বহন করছে। 
 
প্রাচীন মানুষ তাদের জীবন জীবিকার প্রয়োজনে মাংস ও দুধ খাদ্য হিসেবে, পশুর চামড়া বস্ত্র হিসেবে, পশুর হাড় বিভিন্ন হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতো। এটা যেমন বরফের হিমাচলে ফলফলাদি বিহীন জনপদে প্রচলিত ছিলো, তেমনি শস্যশ্যামলা, ফল বৃক্ষরাজি শোভিত অঞ্চলেও আদিম মানুষেরা মাংস দিয়ে ক্ষুধা মেটাতো। 
 
এটা মানুষের জীবনের সাথে এতটাই ওতপ্রোতভাবে জড়িত যে এটা তাদের জন্য একটা যজ্ঞ বা পুণ্যের কাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রাচীন মানুষদের দেখা যায় পশু শিকারের আগে নানা যজ্ঞযন্ত্র পালন করতে আবার পশু শিকার করে জ্যান্ত পশু ধরে নানা গান বাজনা নৃত্য করে তারপর আনুষ্ঠানিকভাবে পশুহত্যা করতে। এই প্রথা আদিম যুগেও যেমন দেখা যায়, দেখা যায় সভ্যযুগেও। 
 
এটা ঐশি কিতাব বিশেষ করে যেসব ধর্ম গ্রন্থ ঈশ্বরের প্রেরিত সেগুলোতে যেমন দেখা যায়, দেখা যায় দেবদেবীতে স্তুতিকারী ধর্মশাস্ত্রেও। একেশ্বরবাদী ধর্মগ্রন্থে যেমন এর প্রচলন আছে, আবার আছে বহুশ্বরবাদী মতবাদেও। ভারতের অনেক প্রদেশে দূর্গা পূজায় মহিষ বলি দেওয়ার নিয়ম এখনো আছে। সনাতনীরা গীতাকে ঈশ্বরের বাণী হিসেবে ধরে নেয়। সেই গীতাতে ভগবান বলছেন– ‘পত্র পুষ্প ফল মূল ভক্তিসহকারে নিবেদন করলে তিনি তা গ্রহণ করেন।’
 
হিন্দু ধর্মে পাঠাবলির কথা সর্বজনসিদ্ধ। এখানে দেবীর উদ্দেশ্যে পাঠা বলি দেয়া হয়। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী পায়ের পদতলে পশুত্বকে বিষর্জন দেয়া হয়। অনেক হিন্দু ধর্মাম্বলী বিশ্বাস করেন যে মা স্বয়ং এই বলি গ্রহণ করেন ফলে বলি দেয়া পাঠার মাংস তুলনামূলক কম স্বাদের হয়ে থাকে। এই স্বাদটা মা গ্রহণ করেন। 
 
সূত্র মতে, দেবীদুর্গাকে মহাদেব শিব বলেছেন, ‘আরাধনানাং সর্বেষাং বিষ্ণোঃ আরাধনা’ মানে – সকল আরাধনার মধ্যে বিষ্ণুর আরাধনাই শ্রেষ্ঠ। শিব শ্রীনারদ পঞ্চরাত্র গ্রন্থে প্রতিদিন কিভাবে শ্রীগোবিন্দের অর্চনা করতে হয় তা দুর্গাদেবীকে নির্দেশ দিয়েছেন। শিব আমিষ ভক্ষণ করেন না। (পদ্মপুরাণ)
 
প্রাচীন ভারতে ষাঁড় দেবতার উদ্দেশ্যে বলির পর এর মাংস খাওয়া হতো। যদিও দুধ দেয়া গরুর অন্তর্ভুক্ত গাভী জবাই নিষিদ্ধ ছিল। হিন্দুদের প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ বেদে গাভীকে দেবতা উল্লেখপূর্বক দেবের মাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। হিন্দুধর্মে গরুকে খাদ্যের উৎস এবং জীবনের প্রতিরূপ হিসেবে সম্মানের সাথে দেখা হয়। মনে করা হয় জৈন ধর্মের প্রভাব থেকে হিন্দুধর্মে গরু নিধন বন্ধ করা হয়। প্রাচীন ভারতে হিন্দুদের মধ্যে যখন গরুর গোশত খাওয়ার অনুমতি ছিল, অবশ্য তখনো বেদে নিরামিষভোজীদের উৎসাহিত করা হয়েছিল। আজো হিন্দু ধর্মে নিরামিষব্রত চালু রয়েছে। ভারতে কোনো কোনো এলাকায় এটা সার্বজনীন।
 
নেপালে প্রতি পাঁচ বছরে একবার উদযাপিত গড়িমাই উৎসবে বারা জেলায় শতশত, হাজার হাজার তীর্থযাত্রী একত্রিত হয়ে প্রায় ৫ লক্ষ গরু কুরবানী দেয় বা বলি দেয়। এই উৎসবে, অংশগ্রহণকারীরা দুই দিনের এই সময়ের মধ্যে ৫০০,০০০ টি প্রাণী বলি দেয়। এই উৎসবের আয়োজকরা  বলছেন,  উৎসব পরিবারের সদস্যদের মাঝে মিলন ঘটায়, যা প্রায়শ তাদের অন্য প্রান্তে নেপাল সীমান্তে বাস করা আত্মীয়কে একত্রিত করে।
 
নেপাল সম্পর্কে ন্যাশনাল জিওগ্রাফির ভাষ্য অনুযায়ী এইদেশেই একই এলাকায় পৃথিবীর সর্বোচ্চ সংখ্যক পশু বলি হয়। প্রতি ৫ বছর পর পর শক্তির দেবী গাধিমাইকে খুশি করার জন্য হাজার হাজার পশু বলি দেওয়া হয়। যদিও এই উৎসবের সূত্রপাত নিয়ে হিন্দু ধর্মে সুনির্দিষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় না। 
  
ইসলাম ধর্মমতে মহান আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য আশায় মনের পশুত্বকে কুরবা্নী দেয়ার প্রতীকীরুপ হলো পশু কুরবা্নী। আদম (আ.) থেকে কুরবা্নীর প্রথা চালু রয়েছে। পূর্ববর্তী অন্যান্য নবী রাসুলগণও কুরবা্নী করেছিলেন। ইতিহাসে বিরল কুরবা্নী দিয়েছিলেন হযরত ইব্রাহিম (আঃ)।পুত্র ও নিজের স্ত্রীকে সুদূর হিজাজ প্রান্তরে ধূ ধূ মরূভূমিতে রেখে আসার হুকুম হয়। তিনি অত্যন্ত দৃঢ় পদে এই কুরবা্নীটি করেন। 
 
তবে জীবনের সর্বশেষ ও সর্ব বৃহৎ কুরবা্নী দিতে হয় তাকে নিজের কলিজার টুকরা পুত্র ইসমাইল (আঃ) এর গলায় ছুরি চালিয়ে। প্রচলিত কুরবা্নী ইব্রাহিম আঃ এর স্মৃতি বজড়িত ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ইব্রাহিম আঃ এর সুন্নাহ হিসেবে উম্মতে মোহাম্মদীর জন্য কুরবা্নী করা ওয়াজিব। 
 
কুরবা্নী ঈদের উদ্দেশ্য নিজেকে কুরবা্নী করা। সে মতে, আমরা নিজেদেরই উৎসর্গ করি প্রতীক হিসেবে হালাল পশু কুরবা্নী করে। পশু কুরবা্নীর মাধ্যমে মূলত মানুষের মধ্যে বিরাজমান পশু শক্তি, ক্রোধ, লোভ, লালসা, পরনিন্দা, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি রিপু গুলোকেও কুরবা্নী দিতে বলা হয়। পশু কুরবা্নীর সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মধ্যে যে পাশবিকতা আছে তাকে ত্যাগ করতে হবে। মনের পশুকে চিরতরে কুরবা্নী দিয়ে মানবতার জয়গান গাইতে হবে। এটাই ইসলামের শিক্ষা।
 
খোদ যুক্তরাষ্ট্রে উৎসব উপলেক্ষ্য বাদ দিলে সবচেয়ে বেশি পশু জবাই হয়। এখানে সাধারণত মাথায় গুলি করে তারা পশু হত্যা করে। কখনো ইনজেকশান বা অন্য উপায়ও গ্রহণ করা হয়। এটা নিয়ে অবশ্য খুব কম বিতর্ক হয়। এছাড়া পশ্চিমা দেশগুলোতে উচ্চ চর্বিযুক্ত শুকরের মাংসকে খুব ভালোভাবেই গ্রহণ করা হয়। বৌদ্ধ ধর্ম ছাড়া আর অন্য কোনো ধর্মেই প্রাণী হত্যার ব্যাপারে নিষেধ থাকলেও নিজেদের প্রয়োজেনে বিশেষ করে হালালপ্রাণী ধর্মসিদ্ধভাবে ভক্ষণ করার বিধান রয়েছে।
 
বিবার্তা/জিয়া
 
সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (২য় তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১১৯২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2019 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com