আসুন মহিদের গল্প শুনি

আসুন মহিদের গল্প শুনি
প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০১৫, ১৯:৩৭:৩৯
আসুন মহিদের গল্প শুনি
মো. মহসিন হোসেন
প্রিন্ট অ-অ+
হাই স্কুলে পড়ার সময় খেলতে গিয়ে হাত ভেঙ্গে গিয়েছিল। প্রথমবারের চিকিৎসায় হাত ঠিক না হওয়ায় বিভিন্ন চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান সেঝ ভাই মিজানুর রহমান। একদিন ফরিদপুরের এক চিকিৎসকের কাছে গেলে তিনি ভাইকে প্রশ্ন করেন আপনার ভাই কেমন ছাত্র।  ভাই উত্তর দেন, আমার ভাই ক্লাসে ফাস্ট। কথাটা পছন্দ হয়নি ছোট ভাই মহিদের। বাইরে এসে ভাইকে প্রশ্ন ছুড়ে দেন। 
আসুন মহিদের গল্প শুনি
ভাইয়া আমিতো ফাস্ট নই, সেকেন্ড।  আপনি কেন ফাস্ট বলনেন? জবাবে ভাই বললেন। সেকেন্ড, একথা মানুষকে বলতে লজ্জা লাগে। তুই ফাস্ট হতে পারিস না? ভাই এর কথায় জেদ হয় মহিদের। সেবার ৮ম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। পন করলেন ক্লাশে প্রথম হতেই হবে। প্রথম থেকে ৮ম শ্রেণি, যতটা না লেখা-পড়া করেছেন তার চেয়ে দ্বিগুণ করলেন শুধু ৯ম শেণিতেই। ফলও পেলেন।
 
ক্লাশে ফাস্টতো হলেনই, দ্বিতীয় যে হলো তার চেয়ে  ৫০ মার্ক বেশিও পেলেন। সফলতার শুরু সেখান থেকেই। এতক্ষণ যার গল্প করছিলাম, নাম তার মহিদুল ইসলাম মহিদ। আসুন আজ শুনি মহিদের সফলতার গল্প। 
 
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিবার্তা অফিসে এসেছিলেন সরকারি এই কর্মকর্তা। বন্ধুসুলভ কথা বললেন বিবার্তার চিফ রিপোর্টার মহসিন হোসেনের সঙ্গে।
আসুন মহিদের গল্প শুনি
রাজবাড়ী সদর উপজেলার কোমরপাড়ায় জন্ম মহিদের। পিতা মো. লাল মিয়া ছিলেন হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। বাবার হাত ধরে ১৯৯১ সালের কোনো এক সকালে ভর্তি হন আলাদিপুর আরসি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
শুরু হয় খাতা কলমের নারাচারা। সেই যে শুরু। আর থামেনি। এখন তিনি সহকারি কর কমিশনার। বর্তমানে আছেন ঢাকার কর অঞ্চল-৪ এ।
 
প্রাইমারির গণ্ডি পেরিয়ে গেলেন হাই স্কুলে। নাম আলাদিপুর মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয়। একই স্কুলে বাবা প্রধান শিক্ষক। ছেলে ছাত্র। কোনো সমস্যা নেই। আর দশজন ছাত্রের মতো এগিয়ে যেতে লাগলেন মহিদও।
 
স্কুল জীবনে খেলাধুলা বা অন্য কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন কি না জানতে চাইলে মহিদ বললেন, অংশতো অবশ্যই নিয়েছি। পুরুস্কারও পেতাম প্রতি বছর। স্কুলের ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় যেমন খুশী তেমন সাজো থেকে শুরু করে কবিতা আবৃতি, গান, গজলেও অনেক পুরুস্কার পেয়েছি। 
আসুন মহিদের গল্প শুনি
ফুটবল ছিল অনেকটা সঙ্গীর মতো। দুরন্ত শৈশবে বেশিরভাগ সময় কেটেছে খেলাধুলা করে। তাইবলে লেখাপড়ায় কমতি ছিল না। ২০০১ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিলেন। ৪.২৫ পেয়ে পাশ করলেন। আশা ছিল এ প্লাস পাওয়ার। কিন্তু তা হয়নি। কারণ তখনকার দিনে এখনকার মতো এ প্লাসের ছড়াছড়ি ছিল না। সেবছর সারাদেশে এ প্লাস পেয়েছিলেন মাত্র ৭২ জন শিক্ষার্থী।
 
মহিদ এ প্লাস পাননি, তাতে কি। ভর্তি হতে হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। যাকে বলা হয় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড। সেই আশা নিয়েই ভর্তি হলেন রাজবাড়ী সরকারি কলেজে। 
 
২০০৩ সালে এইচএসসি পাশ করলেন। চলে এলেন ঢাকায়। টার্গেট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ছোট বেলার সেই স্বপ্ন এবার বাস্তব হতে যাচ্ছে। ‘ক’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিলেন আজকের সহকারি কর কমিশনার মহিদ। কে জানতো তখন তিনি এই চাকরিটা পাবেন। 
 
চাকরির চিন্তা মাথায় ছিল না, তখনও। ‘ক’ ইউনিটে সুযোগ পেতে হবে। এটাই বড় কথা। মেধা তালিকায় ৬৫৯।  ফলাফলের তালিকায় নাম দেখে চোখ ছানাবরা।  খুশীতে আটখান। ঢাবির ছাত্র হয়ে গেলেন মহিদ। ভর্তি হলেন ফলিত পরিসংখ্যান বিভাগে। শুরু হলো বিশ্ববিদ্যালয় জীবন। সিট পেলেন অমর একুশে হলে। আর পেছনে তাকানোর সময় নেই। 
 
বিসিএস এক সোনার হরিণের নাম। লাখ লাখ শিক্ষার্থী প্রতিবছর যেদেশে মাস্টার্স শেষ করে চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ায়, সেদেশে বিসিএস পাশ করে সরকারি কর্মকর্তা হওয়া চারটিখানি কথা নয়। 
 
হাল ছাড়ার পাত্র নন মহিদ। মাস্টার্স শেষ করে বিসিএস দিয়ে প্রথম শ্রেণির সরকারি অফিসার তাকে হতেই হবে। পা বাড়ালেন সামনের দিকে। 
আসুন মহিদের গল্প শুনি
চার ভাই এক বোনের মধ্যে সবার ছোট মহিদ। বড় ভাই ফারুক হোসেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। মেঝ ভাই বজলুর রশিদ মিলন ব্যবসার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
 
থাকেন রাজবাড়ীতেই। সেঝ ভাই ২৭ তম বিসিএস-এ ইকোনোমিক ক্যাডার। বর্তমানে আছেন প্লানিং কমিশনে। একমাত্র বোন জেসমিন আক্তার। চাকরি করেন খাদ্য বিভাগে। খাদ্য পরিদর্শক পদে। মহিদের স্ত্রী মাহফুজা আকতার মায়া এখনো পড়াশুনা করছেন ইডেনে। বাড়ি নাটোরে।
  
এতো গেলো পরিবারের গল্প। লেখাপড়া কিন্তু এখনো শেষ হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করলেন ২০১১ সালে। এর পর পরই অংশ নিলেন ৩০ তম বিসিএসে। এবার ধরা দিল সোনার হরিণ। একবারেই সুযোগ হাতের মুঠোয়। হয়ে গেলেন সহকারি কর কমিশনার। প্রথম কর্মস্থল ছিল ঢাকার কর অঞ্চল-১ । বর্তমানে আছেন কর অঞ্চল-৪ এ।
 
চার বছরের চাকরি জীবন। এরই মধ্যে বিসিএস ট্যাক্সেসন এসোসিয়েশনের নির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন দু’বার। 
 
এবার অন্য কথায় আসি। ট্যাক্স বা কর। এ কথাটি শুনলে অনেকে ভয় পান। কর অফিসে ঘুষ চলে। এমন কথা মানুষে বলাবলি করে। কারণটা কী? মহিদ বললেন, এটা আসলে সত্য নয়। কর অফিসের ঘুষের খবর আকাশে বাতাসে শুধুই ছড়ায়। বিষয়টা সে রকম না। কর অফিসে কর দিতে গেলে কেউ হয়রানি হয় তাও ঠিক না। কর দেয়ার কতগুলো আইন কানুন রয়েছে। সঠিক আইন মেনে যদি কেউ কর দেন, তার জন্য বিষয়টা পানির মতো পরিস্কার। 
 
মহিদ বলেন, সম্প্রতি দুর্নীতি নিয়ে টিআইবি একটি রিপোর্ট দিয়েছে। সেখানে কর বিভাগের দুর্নীতির মাত্রা অনেক কম। সুতরাং আমি বলবো, কর অফিসে দুর্নীতি বেশি হয় এটা সঠিক নয়।  
 
কথাতো অনেক হলো এবার যাবার পালা। মহিদ বললেন, আপনাদের অফিসে এসে ভাল লাগলো। আজ যাচ্ছি। তবে এটাই শেষ নয়। আবারো আসবো। কথা হবে আর একদিন।
 
বিবার্তা/মহসিন      
 
সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (২য় তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১১৯২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2019 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com