সোমপুর মহাবিহার যেন জীবন্ত ইতিহাস

সোমপুর মহাবিহার যেন জীবন্ত ইতিহাস
প্রকাশ : ০১ এপ্রিল ২০১৬, ০৯:৪৭:৩৬
সোমপুর মহাবিহার যেন জীবন্ত ইতিহাস
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+
বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। নওগাঁ জেলা বরেন্দ্রীর অংশ। সন্ধ্যাকর নন্দীর ভাষায় বরেন্দ্রী হলো ‘বসুধারাশি’ ধরিত্রীর মুকুট-মণি। তাই বরেন্দ্রীর অংশ হিসেবে নওগাঁর গুরুত্ব অনেক। এর আয়তন ১৩৩৭ বর্গমাইল। বিশলায়তন এই জেলা ধারণ করে আছে বহু পুরাকীর্তি। এই ভূখণ্ডে পূর্বসূরিদের ব্যবহৃত ভবন থেকে শুরু করে ব্যবহার্য জিনিসপত্র অর্থাৎ বিশেষভাবে বলতে গেলে পুরাতত্ত্ব বা প্রত্নতত্ত্ব যাই বলি না কেন এসব যেমন ধারণ করে আছে ঠিক পাশাপাশি তাদের সংস্কৃতিও লালন করে যাচ্ছে।
 
এ অর্থে নওগাঁ একটি সমৃদ্ধ জেলা। এ জেলায় অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক স্থান আছে যার অধিকাংশ পরিচিত হলেও অনেক নিদর্শনের ইতিহাস বা তথ্য আজও উদঘাটিত হয়নি। নওগাঁ জেলা ঘুরে এসে পাঠকদের সামনে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরেছেন নওগাঁর ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোকে। ঐতিহাসিক নওগাঁর প্রথম পর্বে থাকছে বিশ্ব ঐতিহ্য ‘পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার ধ্বংসাবশেষ’ বা সোমপুর বিহার।
 
ইউনেসকো ঘোষিত সারা বিশ্বের ৭৫০টি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মধ্যে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হচ্ছে নওগাঁ জেলার এই সোমপুর বিহার বা পাহাড়পুরের স্তূপ। পাহাড়ের মত উঁচু ইমারতের জন্যই এই গ্রামের নাম হয়েছে পাহাড়পুর। জেলার বদলগাছী থানা সদর থেকে আট মাইল উত্তর-পূর্বে এই বিহার বা সংঘারামটি অবস্থিত। ইংরেজ প্রত্নতাত্ত্বিক বুকানন হ্যামিলটন পূর্ব-ভারত জরিপের সময় (১৮০৭-১২) এই স্তুপটিকে একটি বৌদ্ধ বিহার বলে অনুমান করেন।
 
১৯২৩ সালে এর খনন কাজ শুরু হয়ে সম্পন্ন হয় ১৯৩৩-৩৪ সালে। পাল বংশের দ্বিতীয় রাজা ধর্মপাল (৭৮১-৮২১) অষ্টম শতকের শেষদিকে এ বিহার নির্মাণ করান। খননকালে প্রাপ্ত একটি মাটির সীল থেকে জানা যায় যে এর নাম সোমপুর বিহার। তবে তিব্বতীয় লামা তারানাথের ইতিহাস থেকে প্রত্নতাত্ত্বিকগণরা সোমপুর বিহারের অস্তিত্ব সম্বন্ধে আগেই ধারণা পেয়েছিল।
 
মোট একাশি বিঘা (২৭একর) জমির উপর সোমপুর বিহার অবস্থিত। নিকটবর্তী জৈন ও হিন্দু মন্দিরের বিভিন্ন উপকরণ এই বিহার নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে বলেও জানা যায়। সোমপুরের এই বিহারটি এশিয়ার মধ্যে বৃহত্তম। এর আয়তন উত্তর-দক্ষিণে ৯২২ ফুট এবং পূর্ব-পশ্চিমে ৯১৯ ফুট। মূল দালানে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জন্য ১৭৭ টি কক্ষ ছিল। আট’শ জন ভিক্ষুর বাসোপযোগী ছিল এ বিহার।
 
জানা যায়, সোমপুর বিহার ব্রহ্মদেশ ও জাভার স্থাপত্যগুলোকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল। এর খননকালে ১২৫ নং কক্ষে একটি মাটির পাত্রে খলিফা হারুন-অর-রশিদের শাসনামলের রৌপ্যমুদ্রা পাওয়া গিয়েছিল। মুদ্রাগুলি খলিফা হারুন-অর-রশিদের রাজত্বকালে ৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে মোহাম্মাদিয়া টাকশাল থেকে উৎকীর্ণ। ধারণা করা হয়, কোন সাধক বা ধর্ম প্রচারক এই মুদ্রাগুলোকে এখানে এনেছিলেন।
 
বিহারের মূল ইমারতের নির্মাণ কৌশল শোভামন্ডিত উন্নত স্থাপত্য কলাকৌশলের ইঙ্গিত বহন করে। এ দালান নির্মাণে তৎকালীন স্থপতিদের নৈপুণ্যের পরিচয়ও পাওয়া যায়। এর বর্তমান উচ্চতা সত্তর ফুট। পিরমিডাকৃতি এই মন্দিরের সব জটিলতর সংযোজনাবলী একটি শুন্যগর্ভ চতুষ্কোণ কক্ষকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। সমস্ত বিহারটি প্রাচীর বেষ্টিত। এর প্রবেশ পথ ও মূল দালানে উঠার সিঁড়ি ছিল উত্তর দিকে।
 
বিহারের পূর্ব-দক্ষিণ কোণার দিকে প্রাচীরের বাইরে একটি বাধানো ঘাট ছিল। যা সন্ধ্যাবতীর ঘাট নামে প্রচলিত। প্রচলিত আছে, মৈদলন রাজার কন্যা সন্ধ্যাবতী এ ঘাটে স্নান করতেন। একদিন তিনি ভেসে যাওয়া একটি জবা ফুলের ঘ্রাণ নেওয়ার পর গর্ভবতী হন এবং কুমারী অবস্থায় এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। এই পুত্র সন্তান ‘সত্যপীর’ নামে পরিচিত। ঘাটের অস্তিত্ব থেকে অনুমান করা যায় যে, বিহারের পাশ দিয়ে একটি নদী প্রবাহিত ছিল।
 
পাল রাজাদের প্রতিষ্ঠিত এই সব বিহার জ্ঞান সাধনা, আরাধনা, ও জ্ঞান বিস্তারের উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। প্রথমে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের আবাসস্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও পরে বিহারগুলি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্রে রুপান্তরিত হয়েছিল। পাহাড়পুরের বিহারও এইভাবে একটি আবাসস্থল থেকে উচ্চতর বিদ্যাপিঠে রুপান্তরিত হয়েছিল বলে জানা গেছে। 
 
আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মত এই বিহারে বহু জ্ঞানীজনের আগমন হতো। অন্য ভূখণ্ড থেকেও বহু বৌদ্ধ জ্ঞানপিপাসু এখানে আসতেন। সোমপুর বিহারে বাস করতেন মহাপণ্ডিতাচার্য বোধিভদ্র। আচার্য অতীশ দীপঙ্কর কিছুকাল এ বিহারে বাস করেছিলেন। তার গুরু রত্নাকর শান্তি সোমপুর বিহারের মহাস্থবির ছিলেন। এখানে আরও অবস্থান করতেন প্রাচীন চর্যাগীতিকার কাহ্নু পা ও তার গুরু জলন্দরী পা ওরফে হাড়ি পা।
 
শিল্পকলা একাডেমির মহা পরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর মহাপরিকল্পনায় এবং দেবাশীষ ঘোষের ভাবনা ও নির্দেশনায় বাংলাদেশের প্রথম প্রত্ননাটক ‘সোমপুর কথন’ এর প্রথম প্রদর্শনী হয় ২০এপ্রিল ২০১৪ সালে নওগাঁ জেলার এই পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারে।
 
‘দ্বাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে সেনদের আগমন ঘটে। তারা পাল রাজত্বের অবসান ঘটিয়ে নিজেরাই শাসনভার গ্রহণ করেন। সেনদের আগমন বর্তমান ভারতের কর্নাটক থেকে এবং তারা ছিলেন ব্রাহ্মণ ধর্মের। ফলে প্রথমেই আঘাত লাগে বৌদ্ধধর্ম ও সোমপুর বিহারে। 
 
তারা ব্যাপকহারে বৌদ্ধ নিধন শুরু করে। তখন অনেক বৌদ্ধভিক্ষু বিহার ছেড়ে নেপাল, তিব্বতসহ পার্শ্ববর্তী দেশে পালিয়ে যান। তখনও কিছু বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী বিহারে ধর্মচর্চা চালাবার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু সেনদের হটিয়ে যখন মুসলিম শাসকদের আগমন ঘটল, তখন বিহারের কার্যক্রম একেবারেই বন্ধ হয়ে যায় এবং কালক্রমে এটি ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়।’
 
এমন  দৃশ্যগুলোকেই প্রত্ননাটক ‘সোমপুর কথন’ এ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বিশ্ব ঐতিহ্যের ধারক এই মহাবিহারের নামকরণ সম্পর্কে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুধাবন না করে আবিষ্কৃত বিহারের নামকরণ করা হয়েছে ‘পাহাড়পুর বিহার’। 
 
প্রাচীন লিপিতে বিহারের নাম সোমপুর মহাবিহার সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও শুধু স্থান নাম বিবেচনায় পাহাড়পুর বিহার নামকরণ যৌক্তিক নয়। ‘আবেগের বশে এমন নামকরণের ফলে বিশ্বের এই ঐতিহ্যের প্রতি পর্যটকদের আকর্ষণ হারানোর পাশাপাশি স্থানটির মর্যাদাকে ক্ষুন্ন করা হয়েছে’ এমন মন্তব্য করে তিনি গণমাধ্যমের মাধ্যমে, সরকার ও পর্যটন বিভাগের কাছে এ বিহারের ঐতিহ্য রক্ষায় প্রাচীন শিলালিপিতে পাওয়া নামানুযায়ি ‘সোমপুর মহাবিহার’ নামকরণের প্রস্তাব দেন।
 
ঐতিহ্যের ধারক এই বিহারে সংস্কার কাজ করতে যেয়ে অনেক জায়গায় সিমেন্ট, ইট, পোড়ামাটির ফলক লাগানো হয়েছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে এ প্রত্নতাত্বিক বলেন, ‘পেশাদার প্রত্নতাত্ত্বিক ও সংরক্ষণবিদের অভাবে সোমপুর মহাবিহারের সংরক্ষণ যথাবস্থায় মেরামত প্রত্নতত্ত্বের নীতিমালা অনুযায়ী সম্পন্ন হয়নি। 
 
বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্তির পর পাহাড়পুর বিহারের সংরক্ষণ কাজে অনেক অর্থ ব্যয় করা হলেও সার্বিক অবস্থার উন্নতির চেয়ে অবনতি হয়েছে আরও। সিমেন্ট, ইট, নয়া পোড়ামাটির ফলক ইত্যাদি যোগ করার জন্যে প্রাচীন এ বৌদ্ধবিহারের আদি রূপ ও বৈশিষ্ট্য অনেকটাই ফিকে রঙ ধারণ করেছে।’
 
বিবার্তা/জিয়া
 
সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (২য় তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১১৯২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com