উচ্ছেদ আতঙ্কে উর্দুভাষী বাংলাদেশিরা

উচ্ছেদ আতঙ্কে উর্দুভাষী বাংলাদেশিরা
প্রকাশ : ০৩ মে ২০১৬, ১৪:২১:০৮
উচ্ছেদ আতঙ্কে উর্দুভাষী বাংলাদেশিরা
জাহিদ হোসেন বিপ্লব
প্রিন্ট অ-অ+
বাংলাদেশের নানা প্রান্তের ১১৬ ক্যাম্পে বসবাসরত উর্দুভাষী জনগোষ্ঠী উচ্ছেদ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে একটি ভূমিদস্যু মহল উর্দুভাষীদের মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁই এসব ক্যাম্প কবজার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
 
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর ইচ্ছা প্রকাশের মাধ্যমে ভারতের বিহারসহ বিভিন্ন রাজ্য থেকে পূর্ববাংলায় এসে অবস্থান নেয় উর্দুভাষী জনগোষ্ঠী। তারপর তাদের ঘরবাড়ি দিয়ে তাদের ঢাকার মিরপুর, মোহাম্মাদপুরসহ বিভিন্ন জেলায় পুনর্বাসন করা হয়। তখনও এই ভারত থেকে আগত উর্দুভাষীদের বিভিন্নভাবে বৈষম্যের শিকার হতে হতো। 
 
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে একটি লুটেরা মহল তাদের ঘরবাড়ি থেকে বেদখল করে ফেলে। তারপর তাদের স্থান হয় আন্তর্জাতিক রেডক্রস স্থাপিত ক্যাম্পগুলোতে। এর পরবর্তী সময় হতে উর্দুভাষী বাংলাদেশিরা তাদের নাগরিক অধিকার থেকে সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত হয়ে ৪৫ বছর ধরে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছে। 
 
১০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৮ ফুট প্রস্থের একটি রুমে পরিবারের প্রায় ১০ থেকে ১২ জন সদস্য নিয়ে অতিকষ্টে বসবাস করতে হচ্ছে। রাতে ঘুমাতে হয় পালাবদল করে। অন্যদিকে আবার ১৯৯৫ সালে মিরপুরস্থ  বিহারি ক্যাম্পগুলোকে নদ-নালা, খাল-বিল দেখিয়ে বহিরাগতদের কাছে বরাদ্দ দেয় তৎকালীন সরকার। পজেশনে থাকার পরও তাদের পজেশন লেটারও দিয়ে দেওয়া হয়। এ জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রের নাগরিক হয়েও তারা রাষ্ট্রের অবহেলায় সবদিক থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। নানান সমস্যায় জর্জরিত প্রতিনিয়ত দু’মুঠো ভাত খেয়ে বেঁচে থাকার লড়াই করা উর্দুভাষীদের অন্যতম আতংকের নাম ক্যাম্প উচ্ছেদ। 
উচ্ছেদ আতঙ্কে উর্দুভাষী বাংলাদেশিরা
উর্দুভাষীরা অভিযোগ করেছেন, উচ্ছেদের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সময় তাদের উপর চালানো হয় হত্যাকাণ্ড। এর মধ্যে উল্লেখ্য একটি নির্মম ঘটনা হচ্ছে কালশী গণহত্যা। ২০১৪ সালের ১৪ জুন গভীর রাতে মিরপুর কালশীর কুর্মিটোলা ক্যাম্পে নারী, পুরুষ, দুধের শিশু, গর্ভবতী মাসহ একই পরিবারের ৯ সদস্যকে ঘরের দরজায় তালা লাগিয়ে আগুন দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এরকম আরোও বহু বর্বরোচিত ঘটনা ঘটেছে উচ্ছেদের উদ্দেশ্যে। ২০০৬ সালে মিরপুর মরাপাড়া ক্যাম্পে আগুন দিয়ে একই পরিবারের ৬ জন সদস্যকে হত্যা করা হয়। রংপুরের ৬ নং ইস্পাহানি ক্যাম্পে আগুন দেয়া হয়। তবে আজ পর্যন্ত কোন হত্যাকাণ্ডেরই বিচার হয়নি। এমনকি বিচার চাইতে গেলেও হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন বিহারিরা। যেমন কালশী হত্যায় এক মাত্র বেঁচে থাকা ইয়াসিন আলীকে হত্যা করা হয়। মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি তো প্রতিনিয়তই চলছে। 
 
২০০৭ সালে উর্দুভাষীদের ভোটাধিকার দাবি করে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করেন উর্দু স্পীকিং পিপলস্ উইথ রিহ্যাবিলিটেশন মুভমেন্টের সভাপতি মো. সাদাকাত খান ফাক্কু ও সাধারণ সম্পাদক শাহিদ আলি বাবলু। যার পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৮ সালের ১৮ মে  উর্দুভাষীদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করে ভোটাধিকার ও জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানের রায় দেন হাইকোর্ট। 
 
চলতি বছরের ২৯ মার্চ হাইকোর্ট ক্যাম্প উচ্ছেদের বিরুদ্ধে করা ৯টি রিট আবেদন খারিজ করে উর্দুভাষী বাংলাদেশিদের পুনর্বাসনের পক্ষে রায় দেন এবং তার সাথে বলেন, ক্যাম্পের বাইরে থাকা উর্দুভাষীদের উচ্ছেদ করা যাবে তবে ক্যাম্পের ভিতরে বসবাসরত জাতীয় পরিচয়পত্রধারী উর্দুভাষীদের যথাসম্ভব পুনর্বাসন করতে হবে।
 
তখন থেকেই কিছু অসাধু মহল ও ভূমিদুস্য হাইকোর্টের দেয়া এই রায়ের অসৎ ব্যবহার করে তাদের ক্যাম্পের ভিতরের অংশ উচ্ছেদ করার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে বলে দাবি করেছেন উর্দু স্পীকিং পিপলস্ ইউথ রিহ্যাবিলিটেশন মুভমেন্টের সভাপতি মো. সাদাকাত খান ফাক্কু। 
 
তিনি বলেন, মাননীয় হাইকোর্ট আমাদের ক্যাম্প উচ্ছেদের পক্ষে রায় দেননি। তারপরও আমাদের ক্যাম্প উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে, দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন প্রকার হুমকি-ধামকি। সারাদেশে প্রায় ১১৬ টি ক্যাম্প রয়েছে। যার মধ্যে ঢাকার মোহাম্মাদপুরে ৬ টি ও মিরপুরে ৩৯ টি ছোট-বড় ক্যাম্প রয়েছে। এতে বসবাস করেন প্রায় ৪ লাখ উর্দুভাষী।
 
উর্দুভাষী ছাত্র আন্দোলন (ইউএসপিএসএম) বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক সাধারণ সম্পাদক মো. ইমরান খান বিবার্তাকে বলেন, ‘আমাদের একমাত্র সম্বল ও বাসস্থান হচ্ছে আমাদের ক্যাম্প। আর ক্যাম্পই যদি না থাকে তাহলে আমরা থাকবো কোথায়? তাই একমাত্র বাসস্থান রক্ষা করতে যদি নিজের প্রাণও দিতে হয় আমরা দিব। কিন্তু পুনর্বাসন না হওয়া পর্যন্ত আমাদের ক্যাম্পগুলো ছাড়বো না। প্রয়োজনে কঠোর থেকে কঠোর কর্মসূচি দিয়ে দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে তুলবো। আমরা কেউ নিজ ইচ্ছায় মানুষের বসবাসে অযোগ্য এই ক্যাম্পগুলোতে থাকছি না। তারপরও এই ক্যাম্পই আমাদের বর্তমানে বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল। তাই পুনর্বাসন ছাড়া আমরা ক্যাম্প ছাড়বো না। কারণ ক্যাম্প ছেড়ে দিলে আমরা যাবো কোথায়? ’
 
বিবার্তা/বিপ্লব/জিয়া
 
সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (২য় তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১১৯২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2019 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com