জঙ্গিবিরোধী জাতীয় ঐক্য যে কারণে হচ্ছে না

জঙ্গিবিরোধী জাতীয় ঐক্য যে কারণে হচ্ছে না
প্রকাশ : ৩১ জুলাই ২০১৬, ১৪:৫৬:২৯
জঙ্গিবিরোধী জাতীয় ঐক্য যে কারণে হচ্ছে না
জাহিদ বিপ্লব
প্রিন্ট অ-অ+
দেশে জঙ্গি হামলা ও হত্যা ঘটনার ফলে বিভিন্ন সময় জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে জঙ্গিবাদ মোকাবেলার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। কিন্তু সম্প্রতি গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে জঙ্গিদের নৃশংস হত্যাযজ্ঞ ও শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতে হামলার পর জাতীয় ঐক্যের বিষয়টি আরো বেশি আলোচিত ও জোরালো হয়ে ওঠে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও রাজনৈতিক ঐক্যের কথা বললেও নানা বিভক্তি ও শর্তের বেড়াজালে ঘুরপাক খাচ্ছে দেশে জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ এবং শান্তি-সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় জাতীয় ঐক্যের বিষয়টি। 
 
এই সন্ত্রাসী হামলার পর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলন ডেকে সব মত ও পথ ভুলে জঙ্গি দমনে জাতীয় ঐক্য গড়ার আহ্বান জানান। বিএনপির দিক থেকে কয়েকদিন জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় তিনটি বিষয় আলোচনায় আনার চেষ্টা করা হয়। সরকারি দল ও ১৪-দলীয় জোট থেকে জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করার পরামর্শ দেয়া হলে বিএনপি ‘শর্তহীন’আলোচনার কথা বলে। অবশ্য বিএনপির নেতারা ঐক্য না হওয়ার জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ী করেন। শোলাকিয়ায় হামলার পর বিএনপি জঙ্গি দমনে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ এতে সরকারের পদত্যাগও দাবি করে। তবে শুরু থেকেই বিএনপির জাতীয় ঐক্যের ডাক নিয়ে ২০-দলীয় জোটের বাইরে কোনো মহলই আশাবাদী কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেনি।
 
এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জঙ্গি দমনে ‘জিরো টলারেন্স’নীতি ঘোষণা করেছেন। দেশজুড়ে চলছে সাঁড়াশি অভিযান। সে অভিযান চলাকালেও জঙ্গি হামলায় খুনের ঘটনা ঘটে। ফলে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দেয়। ব্যাপক সমালোচনার মুখে অস্বস্তিতে পড়ে সরকার। প্রধানমন্ত্রী নিজেও ভবিষ্যতে আরো হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করায় আতঙ্ক পেয়ে বসে সর্বমহলে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় জাতীয় ঐক্যের বিষয়টি আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সরকারের পক্ষ থেকেও দেশজুড়ে জঙ্গিবিরোধী সভা-সমাবেশ ও মানববন্ধন করা হয়। সে সব সমাবেশে সরকারের লোকজনও ঐক্যবদ্ধভাবে জঙ্গি দমনের বিষয়ে কথা বলেন। কিন্তু সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্মে সাংগঠনিক রূপ পাচ্ছে না জাতীয় ঐক্য। 
 
এ বিষয়ে ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল বিএনপি বেশি সোচ্চার হলেও মূল সমস্যা জামায়াতের ব্যাপারে তারা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। নিজ অবস্থান থেকে উদ্যোগ নিতেও দেখা যাচ্ছে না কাউকে। মুখে সবাই ঐক্যের কথা বললেও বাস্তবে কোন পথে কিংবা কী প্রক্রিয়ায় এ ধরনের ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম গড়ে উঠতে পারে, তা নিয়ে সঠিক কোনো দিকনির্দেশনাও নেই কারো মধ্যে। ফলে জাতীয় ঐক্য নিয়ে দ্বিধাবিভক্তি দেখা দিয়েছে। সব দল ও মতকে একত্রিত করে আদৌ এ ধরনের ঐক্য সম্ভব কি না, সংশয় দেখা দিয়েছে তা নিয়েও।
 
বিশেষ করে ১৭ জুলাই গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে ‘জাতীয় ঐক্য হয়ে গেছে। যাদের ঐক্য করার ইচ্ছে বা দরকার, তারা ঐক্যবদ্ধই আছেন। একই সঙ্গে যার যার অবস্থান থেকে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখার’যে মন্তব্য প্রধানমন্ত্রী করেছেন তারপর থেকে জাতীয় ঐক্য নিয়ে দেখা দিয়েছে নতুন মেরুকরণ। শুধু রাজনৈতিক দলই নয়, বিভিন্ন সামাজিক সংস্কৃতিক সংগঠনও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সকল দলকে ঐক্যবদ্ধ হবার আহবান জানিয়ে সভা সেমিনার, সমাবেশ, মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করছে। 
 
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন, বৃহত্তর যশোর জেলা সমিতি, মনিরামপুর উপজেলা সমিতি, যশোর বিভাগ সমিতি, তরিকত ফেডারেশন, ইসলামী আন্দোলন, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ এবং বিভিন্ন বামসংগঠনের পক্ষ থেকে একাধিকবার ঐক্যবদ্ধ হবার আহবান জানালেও বড় দুটি দল কর্ণপাত করছে না।
 
জঙ্গিবাদ একটি জাতীয় সমস্যা হওয়া সত্বেও ২০ দল এবং ১৪ দল একসাথে বসা তো দূরের কথা তারা এই সমস্যা সমাধানে নিজ জোটের নেতাদের সাথেও বসেননি। এমনকি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ একাধিকবার সরকারকে এ বিষয়ে আহবান জানালেও সরকার তা কর্ণপাত করছেন না বলে তিনি নিজেই অভিযোগ করেছেন। 
 
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অবশ্য বলছেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিগুলো চিন্তায় ও কর্মে জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধই আছেন। সরকারের জোটভুক্ত দলগুলোর মধ্যে তো বটেই, জোটের বাইরে থাকা আরো সিপিবি, বাসদ, গণফোরামসহ বামপন্থী রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও সুশীল সমাজের মধ্যে একধরনের জনমতও তৈরি হয়েছে। 
 
জঙ্গি ইস্যুতে ঐক্য চাইছে বিএনপিও। তবে সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জামায়াতে ইসলামী। সরকারের পক্ষে বলা হচ্ছে, জাতীয় ঐক্যে আসতে হলে বিএনপিকে জঙ্গিবিরোধী দল প্রমাণ করতে হবে এবং সেক্ষেত্রে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে হবে। এ শর্তের সঙ্গে একমত বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের কিছু শরিক ও দুই জোটের বাইরের কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, গণফোরাম, সিপিবি, বিকল্পধারাসহ বাম ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলোও। কিন্তু সে শর্ত পূরণে বিএনপির মধ্যে কোনো সদিচ্ছা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। 
 
বিএনপির একাধিক সূত্রে জানা গেছে, খালেদা জিয়া চাচ্ছেন অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐক্যের চেষ্টা করা। সে লক্ষ্যে ২০ ও ১৪ দলীয় জোটের বাইরে থাকা ডা. অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর (বি চৌধুরী) নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ বিকল্পধারা, ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম, আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), আবদুল কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ এবং সিপিবি ও বাসদকে নিয়ে জাতীয় ঐক্য গড়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু জামায়াত বর্জন ইস্যুতে তাদের অভিন্ন বক্তব্য থাকায় ঐক্য নিয়ে আবারও বিপাকে পড়েছে বিএনপি।
 
জাতীয় ঐক্যে বাধা কোথায় এমন প্রশ্নের জবাবে জাপার কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের বিবার্তাকে বলেন, সরকার মনে করে এটা কোন জাতীয় সমস্যা নয়, তাই জাতীয় কোন ঐক্যের প্রয়োজন নেই বলে তারা মনে করে। তাদের ধারণা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দিয়েই চলমান জঙ্গী ও সন্ত্রাসী হামলা প্রতিরোধ সম্ভব।
 
তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিরাট একটি অংশ বিশেষ করে বিএনপি জামায়াত ছাড়াও জনগণের একটি অংশ বর্তমান সরকারকে পছন্দ করছে না। সরকার বিপাকে পড়লে তারা অখুশী নন। তারা মনে করে সরকার দ্বারা নির্যাতিত। যেকোনো দেশে এমন পরিস্থিতি হলে জঙ্গিবাদ দূর করা যায় না। যেমন সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তানে জঙ্গিবাদ সফল হয়েছে। কেননা সেসব দেশে গণতন্ত্র ছিলো না। আমি মনে করি দেশে সুষ্ঠ গণতান্ত্রিক চর্চা থাকলে, জবাবদিহিতা, বাকস্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার থাকলে জঙ্গিবাদ উত্থান হয়তো ঘটতো না।
 
সরকারকেই জাতীয় ঐক্যের ডাক দিতে হবে মন্তব্য করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে.জে. মাহবুবুর রহমান বিবার্তাকে বলেন, কোন দূর্যোগ বা জাতীয় সমস্যা থেকে জাতিকে মুক্তি দিতে হলে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। যেমন : স্বাধীনতার সময় যখন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গোটা জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, জিয়াউর রহমানের যেমন ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।
 
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক ঐক্যের দেশ। আমরা হিন্দু-মুসলিম-খৃষ্টান ভাই ভাই। এমন একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ দেশে যখন জঙ্গীবাদের উত্থান ঘটে তা থেকে পরিত্রাণ পেতে অবশ্যই জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আর এর উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে।
 
এবিষয়ে আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেন, বেগম জিয়া জঙ্গিদের সঙ্গে নিয়ে জঙ্গিবাদবিরোধী সমাবেশ করতে চান। কিন্তু জঙ্গিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীকে বাদ দিতে হবে। আর শেখ হাসিনার নেতৃত্ব মেনে জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করে বিএনপিকে জঙ্গিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্যে আসতে হবে। 
 
জাতীয় ঐক্য প্রসঙ্গে সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বিবার্তাকে বলেন, জাতীয় ঐক্যের কথা আমরা কখনও বলিনি। যার যার অবস্থান থেকে সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
 
বিবার্তা/বিপ্লব/মৌসুমী/হুমায়ুন
 
 
 
সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (২য় তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১১৯২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2020 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com