বঙ্গবন্ধু ও আজকের বাংলাদেশ

বঙ্গবন্ধু ও আজকের বাংলাদেশ
প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০১৬, ১৬:০২:৩৮
বঙ্গবন্ধু ও আজকের বাংলাদেশ
অধ্যাপক ড. মো. শাহিনুর রহমান
প্রিন্ট অ-অ+
১৯৭৫ থেকে ২০১৬ - দীর্ঘ ৪১ বছর পেরিয়ে যাচ্ছে, চলে যাচ্ছে ৪১টি আগস্ট। বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন ভূখন্ডের জন্মের ইতিহাসকে ১৯৭৫ সালের এইদিনে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। 
 
১৯৭৫-এর মোশতাক ষড়যন্ত্র ছিল বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারকে সমূলে হত্যা করার পাশাপাশি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সকল ইতিহাস মুছে ফেলার একটি সুদূরপ্রসারী নীলনক্সা। আজ সেই ঘটনার প্রকৃত সত্য আড়াল করে নতুন এক বানোয়াট ইতিহাস সৃষ্টি করা হয়েছে। স্বাধীনতার মহান রূপকার জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংগ্রামী ইতিহাসকে আড়াল করে বিকৃত তথ্যসম্বলিত পাঠ্য-পুস্তক নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেয়ার অপচেষ্টাও করা হয়েছে। 
 
এ কেমন সভ্যতা ? এভাবে কি কোনো জাতির কল্যাণ হতে পারে ? এ প্রশ্নের জবাব কি ইতিহাস বিকৃতকারীরা জানে না ?
 
সময় গড়িয়েছে, বেড়েছে বিশ্বাসঘাতকের সংখ্যা, বদলেছে গণতন্ত্রের চর্চা। এই বাংলার মাটিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদী বঙ্গবন্ধুর সৈনিকরা  নিত্য মারধর ও হয়রানির মুখোমুখি হয়েছে। রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে এবং মিথ্যা মামলা ও নানা কৌশলে বাংলাদেশী ছদ্মবেশে পাকিস্তানি শোষকদের অত্যাচার-নির্যাতন বহুমাত্রায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। 
 
এ লজ্জা কার ? এ লজ্জা আমাদের সকলের। বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ ধারাবাহিক গণতান্ত্রিক আন্দোলনের চূড়ান্ত প্রকাশ ৭১-এর স্বাধীনতার যুদ্ধ। তাঁরই নেতৃত্বে স্বাধিকার ও স্বাধীনতার জন্য অসহযোগ আন্দোলন থেকে সশস্ত্র সংগ্রাম এবং অবশেষে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সৃষ্টি। ফলে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এক ও অভিন্ন। এ সত্যকে উপেক্ষা করার অর্থ হলো বাঙালী জাতিকে অসম্মানিত করা। কারণ, বিশ্বের মানুষ বঙ্গবন্ধুর জীবনইতিহাস জানে, জানে তাঁর সৃষ্ট বাংলাদেশকে। এটাই যখন সত্য, সে সত্যকে বিকৃত করার অপপ্রয়াস কি বাংলাদেশের মানুষের আইডেনটিটি ক্রাইসিস তৈরী করছে না ? কেনই বা সত্যকে আড়াল কারার অপচেষ্টা, কেনই বা আইডেনটিটি ক্রাইসিস ? এ লজ্জা থেকে মুক্তির একটিই পথ - তা হলো সত্যকে স্বীকার করা এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অনুসরণ করা।  
বঙ্গবন্ধুর মূল লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের শোষণ থেকে বাংলার মানুষকে মুক্ত করা এবং এদেশের মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণ করা। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন সত্যিকার মুক্তি -- অনাহার থেকে, দারিদ্র্য থেকে, অবিচার থেকে, নির্যাতন থেকে। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর  সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথ রুদ্ধ করে দেয়। 
 
১৯৭৫ থেকে ৮২, ৮২ থেকে ৯১ ও ৯১ থেকে ৯৬ পর্যন্ত  জাতি গঠনে কোনো কাজ হয়নি। কেবল বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বাংলার সাংস্কৃতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে জাতি গঠনে একটি পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচী নিয়েছিলেন। 
 
বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর এদেশের রাজনীতির চরিত্র নানাভাবে নষ্ট হয়ে যায়। পতন, অবক্ষয়, ভ্রষ্টতা, অন্ধতা রাজনীতিকে কলুষিত করে ফেলে। ১৯৯৬-এ বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে তার পরিবর্তন ঘটান। দক্ষিণ আফ্রিকার মডেলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় পুনর্বিন্যাস ঘটিয়ে প্রমাণ করলেন, বিকল্প রাজনীতির দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করা এখনও সম্ভব। তিনি আরও প্রমাণ করলেন, বাঙালীর মৃত্যু নেই এবং বাংলাদেশ কখনো পাকিস্তান হবে না; হতে পারে না। 
 
জাতির জন্য সংকটময় বর্তমান এই সময়ে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার সেই পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচীর বাস্তবায়ন বড় বেশি প্রয়োজন। আজ এটিই জাতি গঠনের একমাত্র উপায়। ২০০৯-এ  প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার ভিশন ২০২১ এবং রুপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নের জন্য ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন বাঙালি জাতির সামনে উপস্থাপন করেছেন, তা অবশ্যই এ জাতির সুখ ও সমৃদ্ধির পথ দেখিয়েছে।     
 
বস্তুত বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনায় বাঙালীর একমাত্র ভরসা। এ মূহূর্তে আমাদের প্রয়োজন কর্তব্য, ধৈর্য্, সহিষ্ণুতা ও সংযম। সকল অত্যাচার-অনাচার প্রতিহত করার মনোবল নিয়ে সামনে এগুতে হবে। প্রতিষ্ঠিত করতে হবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ। দরকার জাতির পুনর্গঠন, অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস, প্রশাসনিক শৃংখলা, সন্ত্রাসের নির্মূল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক স্বচ্ছতা। 
 
আজকের বাংলাদেশ সবদিক থেকে বিধ্বস্ত। একই সাথে আমাদের বুঝতে হবে, বাঙালীর আশা-আকাঙ্ক্ষাও অনেক বেশি। সব কিছুর সাথে সঙ্গতি রেখে জাতির ভবিষ্যত কিভাবে নির্মাণ করা যায় তা ভেবে দেখা খুব জরুরী। 
 
আজ বঙ্গবন্ধুর সশরীরী উপস্থিতি নেই। তবে অগণিত মানুষের মনে বেঁচে আছে তাঁর স্পিরিট। মানুষ ভোলেনি তাঁর স্বাধীনতার আহবান : “আমার অনুরোধ, প্রত্যেক গ্রামে, মহল্লায়, ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম কমিটি গড়ে তুলুন। যার যা আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকুন। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, প্রয়োজনে আরো দেবো, তবু এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।”
 
বঙ্গবন্ধুর এই আহবানের মধ্য দিয়ে তাঁর বলিষ্ঠতা, গভীর দেশপ্রেম, ঝুঁকি গ্রহণ -নেতৃত্বের এ সকল গুণাবলী সহজেই উপস্থাপিত হয়। এটাই স্বাভাবিক। কারণ এই মহান নেতা আশৈশব ছিলেন নিপীড়িতের বন্ধু, শোষকের ঘোর শত্রু। তাঁর এই দ্ব্যর্থহীন ঘোষণায় সন্ত্রস্ত  পাকিস্তানি সামরিক জান্তা তাঁকে আবারো কারাগারে বন্দি এবং মিথ্যা মামলায় সাজা দেবার আয়োজন করে। বাংলার সর্বস্তরের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে বঙ্গবন্ধুর আহবানে। এতেই এই মহানায়কের প্রতি জনতার নিরঙ্কুশ ভালোবাসা, আস্থা ও সমর্থন সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়; এভাবেই তিনি হয়ে ওঠেন জাতির পিতা ‘বঙ্গবন্ধু’। 
 
তাঁর স্বাধীনতার ঘোষণা - ‘‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’’ - বাঙালির মুক্তিপথের দিশা। শতাব্দীর পর শতাব্দী অপেক্ষা  করেও এমন যথার্থ ও সময়োপযোগী উচ্চারণের তুলনা হবে না। 
 
বঙ্গবন্ধু আমাদের হাজার বছরের ইতিহাসে একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালি। এই উপমহাদেশে অনেক নেতার আবির্ভাব ও তিরোধান ঘটেছে, কিন্তু বঙ্গবন্ধুই একমাত্র ব্যতিক্রম। এই বিশ্বাসঘাতক জাতি বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করেছে কিন্তু তাঁর বিস্ময়কর ব্যক্তিত্বকে হত্যা করতে পারেনি, তাঁর উত্তরাধিকারকে হত্যা করতে পারেনি। এ জন্যে 'বঙ্গবন্ধু' কেবল ইতিহাসের বিষয় নন, বঙ্গবন্ধু প্রতিটি মানুষের বেঁচে থাকার সবুজ সপ্রাণ ভরসা, সর্বোপরি এক অপ্রতিরোধ্য জীবনবাদ। 
 
আমেরিকার ব্রিটিশ কলোনির জনগণ, ফরাসী বিপ্লবের সময় ফরাসী জনগণ, রুশ বিপ্লবের সময় রুশ বিপ্লবীরা অত্যন্ত চড়া রঙে নিজ নিজ স্বাধীন ভূমির ছবি এঁকেছিলেন। আমরাও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশের ছবি এঁকেছিলাম; স্বাধীনতা পেয়েছি। কিন্তু যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বাংলাদেশ নামক দেশের নির্মাণকাজ শেষ না হতেই আমরা অভিভাবকহীন হয়েছি। সে কারণে আমাদের উচিত বঙ্গবন্ধুর জীবন থেকে প্রতিটি ক্ষেত্রে শিক্ষা নেয়া। বঙ্গবন্ধু আর বাংলাদেশের ইতিহাস যদি এ প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা না যায়, তাহলে ইতিহাস থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ কখনই পূর্ণ হবার নয়।   
 
লেখক :  উপ-উপাচার্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
 
বিবার্তা/মৌসুমী/হুমায়ুন
 
 
সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (২য় তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১১৯২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2024 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com